আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা🍁🍁✨লেখক: আব্দুল মুসরেফ খাঁন

আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা

লেখক: আব্দুল মুসরেফ খাঁন

আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি হলো—মানুষ যত বেশি জ্ঞান ও প্রযুক্তির কাছে পৌঁছেছে, ততই তাকে নিজের মন, সময়, চিন্তা এবং অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। উপস্থাপিত ছবির মূল বক্তব্য এই গভীর বাস্তবতাকেই অত্যন্ত সহজ অথচ শক্তিশালী প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরে। ছবির বাম দিকে রয়েছে একটি খোলা দরজা, তার ওপরে লেখা “বিনামূল্যে বই” এবং নিচে লেখা “জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে”; আর ডান দিকে রয়েছে “বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই”-এর প্রতীক, যার সামনে অসংখ্য মানুষকে এমনভাবে ছুটতে দেখা যায় যেন তারা কোনো অদৃশ্য আকর্ষণের দ্বারা টেনে নেওয়া হচ্ছে, আর নিচে লেখা—“আসক্তি মানুষকে দাস বানায়”। এই দুটি দৃশ্যকে পাশাপাশি রাখলে আধুনিক মানুষের সামনে থাকা দুটি সম্ভাব্য পথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে আছে জ্ঞান, মনন, আত্মশিক্ষা, ধৈর্য, যুক্তি ও স্বাধীন চিন্তার পথ; অন্যদিকে আছে প্রযুক্তির প্রতি অচেতন নির্ভরতা, অতিরিক্ত বিনোদন, মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা, সময়ের অপচয় এবং এমন এক মানসিক অভ্যাস, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায় প্রযুক্তি ব্যবহার না করে প্রযুক্তির তৈরি অভ্যাসের দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করে। এখানে “বই” কোনো নির্দিষ্ট কাগজের বস্তু মাত্র নয়; বই প্রতীক জ্ঞানের, ইতিহাসের, অভিজ্ঞতার, চিন্তার, সাহিত্যিক কল্পনার, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এবং মানবসভ্যতার সঞ্চিত স্মৃতির। আর “ওয়াই-ফাই”ও কেবল একটি প্রযুক্তিগত সংযোগ নয়; এটি আধুনিক ডিজিটাল জগতের অসীম প্রবেশদ্বারের প্রতীক। সেই প্রবেশদ্বার দিয়ে মানুষ জ্ঞানের মহাসাগরে প্রবেশ করতে পারে, আবার একই সঙ্গে বিভ্রান্তি, গুজব, অতিরিক্ত বিনোদন, অর্থহীন স্ক্রলিং এবং ডিজিটাল আসক্তির গোলকধাঁধায়ও হারিয়ে যেতে পারে। তাই ছবিটির বক্তব্যকে সরলভাবে “বই ভালো, ইন্টারনেট খারাপ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং এর প্রকৃত শিক্ষা হলো—মানুষের হাতে থাকা কোনো প্রযুক্তি বা সম্পদ নিজে মুক্তি কিংবা দাসত্বের কারণ নয়; তার ব্যবহার, উদ্দেশ্য, মাত্রা এবং ব্যবহারকারীর আত্মনিয়ন্ত্রণই ফল নির্ধারণ করে। একটি বই যদি মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়, অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে শেখায়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে শেখায় এবং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, তবে সেই বই মানুষের মানসিক স্বাধীনতার দরজা খুলে দেয়। “জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে”—এই বাক্যের গভীরতা এখানেই। জ্ঞান মানুষকে কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে না; জ্ঞান তাকে অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, গুজবকে প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রতারণা চিনতে সাহায্য করে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে। একজন জ্ঞানী মানুষ কোনো কথা শুধু অনেক মানুষ বলছে বলে বিশ্বাস করেন না; তিনি জানতে চান কথাটির উৎস কী, প্রমাণ কী, যুক্তি কী এবং তার বাস্তবতা কতটা। ফলে জ্ঞান মানুষের স্বাধীনতার ভিত শক্ত করে। একটি ভালো বই একজন পাঠকের সামনে এমন এক জগৎ খুলে দিতে পারে, যেখানে সে নিজের বাস্তব জীবনের সীমা অতিক্রম করে পৃথিবীর নানা সভ্যতা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। একজন দরিদ্র পরিবারের ছাত্র যদি বিনামূল্যে একটি ভালো বই পায়, সেই বই তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একটি জীবনী তাকে সংগ্রাম করতে শেখাতে পারে, একটি বিজ্ঞান বই তার কৌতূহল জাগাতে পারে, একটি সাহিত্যকর্ম তার হৃদয়কে কোমল করতে পারে, একটি ইতিহাসের বই তাকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করতে পারে, আর একটি দর্শনের বই তাকে নিজের অস্তিত্ব ও সমাজ সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শেখাতে পারে। বই পড়ার একটি বিশেষ শক্তি হলো—এটি মানুষকে ধৈর্য শেখায়। একটি দীর্ঘ বই পড়তে হলে পাঠককে একটি বিষয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়। তাকে তাড়াহুড়ো করে পরের বিষয়ের দিকে যেতে হয় না। সে একটি যুক্তিকে অনুসরণ করে, একটি চরিত্রের বিকাশ দেখে, একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কারণ ও পরিণতি বোঝে, একটি বৈজ্ঞানিক ধারণাকে ধাপে ধাপে উপলব্ধি করে। এই দীর্ঘ মনোযোগের অভ্যাস আধুনিক যুগে অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ আজকের ডিজিটাল পরিবেশে মানুষের মনোযোগকে ক্রমাগত ভাঙা হচ্ছে। একটি নোটিফিকেশন, একটি বার্তা, একটি ভিডিও, একটি বিজ্ঞাপন, একটি সংবাদ, একটি মন্তব্য, একটি নতুন পোস্ট—প্রতিটি জিনিস মানুষের মনোযোগকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে। মানুষ কোনো একটি কাজ শুরু করে অন্য একটি বিষয়ের দিকে চলে যায়, তারপর আরেকটি বিষয়, তারপর আরেকটি। শেষ পর্যন্ত দিনের অনেক সময় চলে যায়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ হয় না। এই অবস্থাকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়; আধুনিক ডিজিটাল পরিবেশের কাঠামোও মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নতুন বিষয়ের ধারাবাহিকতা, স্বয়ংক্রিয় সুপারিশ, নোটিফিকেশন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা মানুষের কৌতূহলকে বারবার সক্রিয় করে। ফলে “আর মাত্র পাঁচ মিনিট” করতে করতে এক ঘণ্টা, কখনও তারও বেশি সময় কেটে যায়। এখানেই ছবির ডান দিকের ভিড়টি একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতীক হয়ে ওঠে। সেখানে মানুষ যেন কোনো জরুরি জীবনধারণের প্রয়োজনের জন্য নয়, একটি অদৃশ্য ডিজিটাল আকর্ষণের জন্য ছুটছে। বাস্তব জীবনে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই অবশ্যই একটি মূল্যবান সামাজিক সুবিধা হতে পারে। এটি শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষায় সাহায্য করতে পারে, গবেষকদের তথ্য পেতে সাহায্য করতে পারে, চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে, ব্যবসায়ীদের নতুন বাজারে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে সরকারি পরিষেবা ও প্রয়োজনীয় তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। কিন্তু একটি সুবিধা তখনই কল্যাণকর যখন মানুষ সেটিকে নিজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। যদি প্রযুক্তির ব্যবহার উদ্দেশ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে সুবিধা ধীরে ধীরে নির্ভরতা এবং নির্ভরতা ধীরে ধীরে আসক্তিতে রূপ নিতে পারে। এই আসক্তির লক্ষণ সবসময় নাটকীয় হয় না। অনেক সময় তা শুরু হয় ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে—অকারণে বারবার ফোন দেখা, কোনো নোটিফিকেশন না থাকলেও স্ক্রিন খুলে দেখা, পড়াশোনার মাঝখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাওয়া, খাবারের সময় ফোন ব্যবহার করা, ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় ভিডিও দেখা, সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া অথবা কোনো কাজের সময় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা। এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের সময়ের ওপর প্রভাব ফেলে। সময়ের অপচয় শুধু কয়েকটি মিনিটের অপচয় নয়; জীবনের দীর্ঘ সময় ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে হারিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের মস্তিষ্ক, অভ্যাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনের সময় যদি অতিরিক্ত ডিজিটাল উদ্দীপনার মধ্যে কাটে, তাহলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়া, চিন্তা করা বা কোনো সৃজনশীল কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাস দুর্বল হতে পারে। তবে এখানে প্রযুক্তিকে শত্রু বানানো কোনো সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তিকে জ্ঞানের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে শেখানোই প্রকৃত সমাধান। আজ একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে ডিজিটাল লাইব্রেরি ব্যবহার করা যায়, ই-বুক পড়া যায়, অনলাইন অভিধান দেখা যায়, শিক্ষামূলক বক্তৃতা শোনা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত কোর্সে অংশ নেওয়া যায়, গবেষণাপত্র খোঁজা যায় এবং নতুন ভাষা শেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রযুক্তিকে নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহার করে এবং কাজ শেষ হলে সেটি সরিয়ে রাখতে পারে, তাহলে প্রযুক্তি তার স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু যদি সে প্রযুক্তি বন্ধ করতে না পারে, কাজের সময়ও বারবার সেটির দিকে ফিরে যায় এবং নিজের সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে প্রযুক্তি তার স্বাধীনতার পরিবর্তে নির্ভরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আধুনিক যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো—প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখার পাশাপাশি প্রযুক্তি কখন ব্যবহার না করতে হবে, সেটিও শেখা। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রকৃত শক্তি হতে পারে। (১)

আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে যে বিপুলভাবে পরিবর্তন করেছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে দূরত্ব একসময় মাসের পর মাস লাগত, তা এখন কয়েক সেকেন্ডে অতিক্রম করা যায়। একজন মানুষ অন্য মহাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন, একটি ছোট ব্যবসা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতা খুঁজে পেতে পারে, একজন ছাত্র নিজের গ্রামের ঘরে বসে দূরের শিক্ষকের কাছ থেকে পাঠ নিতে পারে, একজন গবেষক অন্য দেশের লাইব্রেরির তথ্য সম্পর্কে জানতে পারে এবং একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি পরিষেবার অনেক তথ্য অনলাইনে পেতে পারে। চিকিৎসা, কৃষি, পরিবহন, ব্যাংকিং, ব্যবসা, শিক্ষা, সংবাদ, বিনোদন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করেছে। এই বাস্তবতার কারণে ইন্টারনেটকে কেবল আসক্তির উৎস হিসেবে দেখলে ছবিটির বার্তাও অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। “বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই” যদি সঠিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি সত্যিই জ্ঞানের একটি উন্মুক্ত দরজা হতে পারে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন সহজলভ্যতার সঙ্গে সচেতনতা সমানভাবে বৃদ্ধি পায় না। মানুষের হাতে যত বেশি তথ্য আসে, তত বেশি প্রয়োজন হয় তথ্য যাচাই করার ক্ষমতার। একসময় তথ্যের অভাব ছিল বড় সমস্যা; আজ অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের অতিরিক্ততা নিজেই একটি সমস্যা। একই বিষয় নিয়ে শত শত মতামত, হাজার হাজার পোস্ট, অসংখ্য ভিডিও এবং নানা ধরনের সংবাদ মানুষের সামনে আসে। কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়, সব ভিডিও নির্ভরযোগ্য নয়, সব ছবি বাস্তব নয় এবং জনপ্রিয় কোনো বক্তব্য মানেই তা প্রমাণিত সত্য নয়। ফলে আধুনিক যুগে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত “তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা”। একজন ছাত্রকে শেখাতে হবে কীভাবে একটি তথ্যের উৎস খুঁজতে হয়, একই ঘটনা সম্পর্কে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস দেখতে হয়, তারিখ যাচাই করতে হয়, ছবি বা ভিডিওর প্রেক্ষাপট বুঝতে হয় এবং আবেগপ্রবণ শিরোনাম দেখে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিতে হয়। কারণ ভুল তথ্যের যুগে জ্ঞান মানে শুধু বেশি তথ্য জানা নয়; বরং কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য এবং কোনটি নয়, সেই পার্থক্য বুঝতে পারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো তুলনার সংস্কৃতি। মানুষ সেখানে অন্যের জীবনের নির্বাচিত অংশ দেখতে পায়—সাফল্য, আনন্দ, ভ্রমণ, সুন্দর ছবি, নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, পুরস্কার, অনুষ্ঠান, খাবার, পোশাক বা সামাজিক স্বীকৃতি। কিন্তু মানুষের বাস্তব জীবনের দুঃখ, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, একাকিত্ব এবং সংগ্রামের অংশ সাধারণত সেইভাবে প্রকাশ পায় না। ফলে কেউ যদি অন্যের অনলাইন জীবনকে নিজের সম্পূর্ণ বাস্তব জীবনের সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে নিজের জীবনকে অপ্রতুল মনে হতে পারে। লাইক, শেয়ার ও মন্তব্যের সংখ্যা তখন আত্মমূল্যবোধের এক ধরনের অদৃশ্য মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে। মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে—আমাকে কতজন দেখছে, কতজন পছন্দ করছে, কতজন অনুসরণ করছে। অথচ মানুষের প্রকৃত মূল্য কোনো ডিজিটাল সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। একজন মানুষের মূল্য তার চরিত্র, সততা, জ্ঞান, শ্রম, সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি অবদানে। তাই ডিজিটাল যুগে আত্মপরিচয়ের একটি সুস্থ ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। প্রযুক্তি আমাদের প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু আমাদের পরিচয়ের সম্পূর্ণ সংজ্ঞা নয়। একইভাবে অনলাইন সম্পর্ক বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। মানুষ সামাজিক প্রাণী; তার প্রয়োজন মুখোমুখি কথোপকথন, পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, প্রতিবেশীসুলভ সহযোগিতা, খেলাধুলা, প্রকৃতির সংস্পর্শ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ। যদি একজন মানুষ হাজার মানুষের অনলাইন যোগাযোগের মধ্যে থেকেও নিজের পরিবার, বন্ধু বা প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলার সময় না পান, তাহলে প্রযুক্তির যোগাযোগের বিস্তার সত্ত্বেও তার সামাজিক জীবন সংকুচিত হতে পারে। এখানেই বইয়ের আরেকটি শক্তি দেখা যায়। বই মানুষকে একান্ত সময় দেয়। পাঠক ও বইয়ের সম্পর্কের মধ্যে তাৎক্ষণিক সামাজিক স্বীকৃতির চাপ থাকে না। একটি বই পড়তে বসে মানুষ নিজের ভেতরের জগতের সঙ্গে দেখা করতে পারে। সে নিজের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। সে অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পড়ে নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা করতে পারে। সাহিত্য বিশেষভাবে মানুষের সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। একটি উপন্যাসের চরিত্রের জীবন পড়তে পড়তে পাঠক এমন মানুষের অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারেন, যাদের সঙ্গে বাস্তব জীবনে তার কখনও দেখা হয়নি। ইতিহাস পড়ে সে বুঝতে পারে একটি সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; বিজ্ঞান পড়ে সে প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে শেখে; অর্থনীতি পড়ে সম্পদ ও বৈষম্যের সম্পর্ক বোঝে; রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ে ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারের ধারণা সম্পর্কে সচেতন হয়; দর্শন পড়ে সত্য, নৈতিকতা ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখে। তাই বই একটি নীরব শিক্ষক। তার কণ্ঠ উচ্চ নয়, কিন্তু তার প্রভাব গভীর হতে পারে। সমাজে বিনামূল্যে বইয়ের ব্যবস্থা করা তাই শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সহায়তা নয়; এটি সামাজিক সমতা তৈরির একটি মাধ্যম। অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের শিশু যদি শত শত বই কিনতে পারে কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি একটি বই কিনতেও সমস্যায় পড়ে, তাহলে জ্ঞানপ্রাপ্তির সুযোগ অসম হয়ে যায়। গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়ের পাঠাগার, কমিউনিটি লাইব্রেরি, বই বিনিময় কর্মসূচি এবং বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে বই বিতরণ এই বৈষম্য কমাতে পারে। একটি সমাজে বইয়ের সহজলভ্যতা যত বাড়বে, মানুষের চিন্তার পরিসরও তত বাড়ার সুযোগ পাবে। তবে একই সঙ্গে বইকে ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রযুক্তি পরিচিত; তাই ই-বুক, অডিওবুক, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং অনলাইন পাঠচক্রকে বই পড়ার সংস্কৃতির অংশ করা যেতে পারে। এতে “বই বনাম প্রযুক্তি” ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব দূর হবে। বরং বই ও প্রযুক্তি একে অপরের সহযোগী হতে পারে। একটি ছাপা বই পাঠককে গভীর পাঠের অভিজ্ঞতা দিতে পারে, আর ইন্টারনেট তাকে অতিরিক্ত তথ্য, মানচিত্র, ছবি, বক্তৃতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। কিন্তু এই সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। পরিবারের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু ফোন থেকে দূরে রাখতে বললে হবে না; তাকে বিকল্প অর্থপূর্ণ কর্মকাণ্ড দিতে হবে। বাড়িতে বই পড়ার পরিবেশ, গল্পের সময়, আলোচনার সময়, খেলাধুলার সুযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সৃজনশীল কাজের সুযোগ থাকলে শিশুর জীবন শুধু স্ক্রিনকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে না। বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। বড়রা যদি প্রতিনিয়ত ফোনে ব্যস্ত থাকেন, অথচ সন্তানকে ফোন কমাতে বলেন, তাহলে শিশুর কাছে সেই নির্দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। তাই পরিবারে নির্দিষ্ট সময় “স্ক্রিন-মুক্ত” রাখা যেতে পারে। খাবারের টেবিলে ফোন না রাখা, পড়াশোনার সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার না করা এবং দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বই পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। ছাত্রদের শেখানো দরকার যে ইন্টারনেট শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; এটি একটি বিশাল শিক্ষাক্ষেত্র। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রকে বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে ফেললে তার মূল্য নষ্ট হয়। শিক্ষক যদি বলেন “ফোন ব্যবহার করো না”, তাহলে অনেক ছাত্র বাস্তবতার সঙ্গে সেই নির্দেশের সম্পর্ক খুঁজে পাবে না। বরং বলা উচিত—“ফোন ব্যবহার করো, কিন্তু উদ্দেশ্য নিয়ে করো।” একটি শিক্ষার্থীকে বলা যেতে পারে, আজকের পড়ার বিষয় সম্পর্কে অনলাইনে একটি নির্ভরযোগ্য বক্তৃতা দেখো, তারপর মূল বই পড়ো, নিজের ভাষায় নোট তৈরি করো এবং শেষে ফোনটি সরিয়ে রেখে নিজের চিন্তা লিখে ফেলো। এতে প্রযুক্তি ও বই উভয়ই শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রেও ডিজিটাল শৃঙ্খলা প্রয়োজন। সারাক্ষণ নোটিফিকেশন দেখে কাজের দক্ষতা বাড়ে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে ই-মেইল বা বার্তা দেখা, গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় মনোযোগের পরিবেশ তৈরি করা এবং অপ্রয়োজনীয় ডিজিটাল বিভ্রান্তি কমানো আধুনিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। সমাজের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ অল্প যাচাইয়ে কোনো গুজব ছড়িয়ে দেয়, তখন সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। কোনো ব্যক্তির ছবি বা বক্তব্য ভুল প্রেক্ষাপটে ছড়িয়ে পড়লে তার সামাজিক ক্ষতি হতে পারে। তাই ডিজিটাল স্বাধীনতার সঙ্গে ডিজিটাল দায়িত্বও থাকতে হবে। মতপ্রকাশের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অধিকার অন্যের মর্যাদা নষ্ট করার অনুমতি নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় সত্য, শালীনতা, গোপনীয়তা এবং মানবিকতার মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি। একটি সভ্য সমাজের প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে তার নৈতিক উন্নতিও দরকার। অন্যথায় শক্তিশালী প্রযুক্তি দুর্বল নৈতিকতার হাতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে ছবির “আসক্তি মানুষকে দাস বানায়” কথাটি একটি সতর্কতা। দাসত্ব এখানে কোনো আইনি বা রাজনৈতিক দাসত্ব নয়; এটি মানসিক ও আচরণগত নির্ভরতার প্রতীক। যে মানুষ জানেন তিনি ফোন ব্যবহার করছেন, তিনি স্বাধীন ব্যবহারকারী; কিন্তু যে মানুষ জানেন ফোন না দেখলে অস্বস্তি হয়, কাজ থামিয়ে বারবার স্ক্রিন পরীক্ষা করতে হয়, দীর্ঘ সময় স্ক্রল না করলে অস্থির লাগে এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, তিনি নিজের আচরণের ওপর পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন অনুভব করতে পারেন। তাই প্রযুক্তির যুগে স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা দরকার—যে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজনে প্রযুক্তি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে, সেই প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তির স্বাধীন ব্যবহারকারী। (২)

আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা আমাদের সামনে তাই কোনো একক সিদ্ধান্তের দাবি করে না; বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের আহ্বান জানায়। আমাদের বইও দরকার, ইন্টারনেটও দরকার; জ্ঞানও দরকার, প্রযুক্তিও দরকার; দ্রুত তথ্যও দরকার, আবার গভীর চিন্তার সময়ও দরকার। প্রশ্ন হলো—আমরা কোনটিকে কীভাবে ব্যবহার করব। ছবির বাম দিকের দরজাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি পথ সবসময় খোলা থাকে। সেই দরজা হতে পারে বইয়ের পাতা, বিদ্যালয়ের পাঠ, গ্রন্থাগার, শিক্ষক, গবেষণা, অভিজ্ঞতা কিংবা কোনো মানুষের জীবনকাহিনি। দরজা খোলা মানেই মানুষকে তার ভেতরে প্রবেশ করতে হবে—এমন নয়; প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত মানুষকেই নিতে হয়। একইভাবে ইন্টারনেটের অসীম জগতও একটি খোলা দরজা। সেখানে অমূল্য জ্ঞান আছে, আবার বিপুল বিভ্রান্তিও আছে। একজন সচেতন মানুষ জানেন যে বাজারে মূল্যবান জিনিসের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় জিনিসও থাকে; তাই তিনি বেছে নেন। ডিজিটাল জগতেও একই বোধ দরকার। কোন বিষয় দেখব, কতক্ষণ দেখব, কেন দেখব, দেখার পর কী শিখব এবং কখন বন্ধ করব—এই প্রশ্নগুলো নিজেকেই করতে হবে। আধুনিক যুগে “মনোযোগ” একটি মূল্যবান সম্পদ। অর্থ, সম্পদ বা জমি হারালে মানুষ অনেক সময় আবার অর্জন করতে পারে; কিন্তু জীবনের যে সময় চলে যায়, তা ফিরে আসে না। তাই সময়ের প্রতি সম্মান প্রযুক্তি ব্যবহারের মূলনীতি হওয়া উচিত। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন মাত্র এক ঘণ্টা অর্থপূর্ণ বই পড়ে, বছরে তার কাছে একটি বড় জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি হতে পারে। একইভাবে যদি প্রতিদিন অকারণে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রল করে, তাহলে বছরে শত শত ঘণ্টা হারিয়ে যেতে পারে। এই হিসাব শুধু সময়ের নয়; হারিয়ে যাওয়া সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে পড়াশোনা, দক্ষতা, শরীরচর্চা, সৃজনশীলতা, সম্পর্ক ও আত্মউন্নয়নের সুযোগ। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে “ডিজিটাল বাজেট” ধারণা তৈরি করা দরকার—যেমন মানুষ অর্থের বাজেট করে, তেমন সময়েরও বাজেট করা যায়। পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, বিশ্রাম, শরীরচর্চা, বই পড়া, প্রযুক্তি ব্যবহার—প্রতিটির জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকা দরকার। বিশেষ করে তরুণদের জন্য এই অভ্যাস ভবিষ্যৎ জীবনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, অনলাইন যোগাযোগ এবং ডিজিটাল অর্থনীতি মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া বা প্রত্যাখ্যান করা ভবিষ্যতের সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মানবিক দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে—সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ, সহমর্মিতা, নেতৃত্ব, নৈতিক সিদ্ধান্ত, সমস্যা সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ। মেশিন তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে, কিন্তু মানুষকে ঠিক করতে হয় সেই তথ্যের অর্থ কী এবং তা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের প্রতিযোগিতা নয়; বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানুষের চিন্তাশক্তিকে আরও উন্নত করা। এই ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি; বরং নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনের যুগে মানুষকে গভীর চিন্তা করার জন্য এমন মাধ্যম দরকার, যা তাকে কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনার বাইরে নিয়ে যেতে পারে। বই সেই সুযোগ দেয়। তাই স্কুলে শুধু পরীক্ষার বই নয়, আনন্দপাঠ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী, সাহিত্য, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ভ্রমণকাহিনি ও বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানমূলক বই সহজলভ্য করা দরকার। ছাত্রকে বই পড়তে বাধ্য করার বদলে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করানো দরকার। শিক্ষক একটি বইয়ের গল্প বলবেন, চরিত্র নিয়ে আলোচনা করবেন, প্রশ্ন করবেন, ছাত্রদের নিজেদের মতামত লিখতে দেবেন। এতে পাঠাভ্যাস আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হবে। একইভাবে ডিজিটাল শিক্ষাকেও আনন্দময় কিন্তু উদ্দেশ্যপূর্ণ করা যায়। অনলাইন কুইজ, শিক্ষামূলক ভিডিও, ভার্চুয়াল ল্যাব, ডিজিটাল মানচিত্র, ভাষা শেখার সফটওয়্যার—এসব শিক্ষার্থীর শেখাকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে বিনোদনের সীমারেখা বজায় রাখতে হবে। প্রযুক্তি যেন শিক্ষার্থীর কৌতূহল বাড়ায়, মনোযোগ ভেঙে না দেয়। এই ভারসাম্য তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। সরকারি বা সামাজিকভাবে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই দেওয়া হলে তার সঙ্গে ডিজিটাল শিক্ষার কর্মসূচি, নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রশিক্ষণ যুক্ত করা যেতে পারে। বিনামূল্যে বই বিতরণের ক্ষেত্রেও শুধু বই হাতে তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; পাঠাগার, পাঠচক্র, শিক্ষক-নির্দেশিত পাঠ, বই আলোচনা এবং বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ বইয়ের শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন মানুষ বই পড়ে চিন্তা করে এবং সেই চিন্তা জীবনে প্রয়োগ করে। একইভাবে ইন্টারনেটের শক্তিও তখনই ইতিবাচক হয়, যখন মানুষ তা ব্যবহার করে জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক উন্নতির জন্য। আধুনিক সমাজে আরও একটি বড় বিষয় হলো—শিশুদের সামনে প্রযুক্তির আদর্শ ব্যবহার দেখানো। বড়রা যদি বই পড়েন, শিশু বইয়ের গুরুত্ব বুঝবে। বড়রা যদি ফোন ব্যবহার করার সময় সীমা মানেন, শিশু সেই আচরণ অনুসরণ করতে পারে। পরিবারে যদি আলোচনার সংস্কৃতি থাকে, তাহলে শিশুরা শুধু স্ক্রিনে উত্তর খুঁজবে না; মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতেও শিখবে। তাই প্রযুক্তির সমস্যার সমাধান প্রযুক্তি ধ্বংস নয়, বরং সংস্কৃতি পরিবর্তন। আমাদের এমন একটি সংস্কৃতি দরকার যেখানে বই পড়া সম্মানের বিষয়, প্রশ্ন করা উৎসাহের বিষয়, তথ্য যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ, ফোন বন্ধ রাখা দুর্বলতা নয় বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের লক্ষণ, এবং অন্য মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি সময় কাটানো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের নতুন প্রজন্মকে বলতে হবে—তোমার হাতে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারের দরজা রয়েছে, কিন্তু সেই দরজায় প্রবেশ করার আগে নিজের লক্ষ্য ঠিক করো। ইন্টারনেটে যা পাওয়া যায় সব গ্রহণ করার দরকার নেই। যেমন বাজারে সব খাবার স্বাস্থ্যকর নয়, তেমন অনলাইনে সব তথ্যও গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন একটি শহরে অনেক রাস্তা থাকে কিন্তু প্রতিটি রাস্তা গন্তব্যে পৌঁছায় না, তেমন ডিজিটাল জগতেও অসংখ্য পথ আছে কিন্তু সব পথ জ্ঞানের দিকে যায় না। তাই ডিজিটাল নেভিগেশনের পাশাপাশি নৈতিক নেভিগেশনও দরকার। মানুষকে শিখতে হবে কখন থামতে হয়। এই “থামা” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভিডিওর পরে আরেকটি ভিডিও না দেখে বইয়ের একটি অধ্যায় পড়া; একটি অনলাইন বিতর্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা না থেকে নিজের কাজ শেষ করা; রাত জেগে স্ক্রিন দেখার পরিবর্তে পর্যাপ্ত ঘুম নেওয়া; অন্যের জীবন অনুসরণ করার পরিবর্তে নিজের জীবনের উন্নতিতে মন দেওয়া—এসবই আধুনিক আত্মনিয়ন্ত্রণের উদাহরণ। প্রযুক্তি যদি আমাদের কাজ দ্রুত শেষ করে, তাহলে সেই অতিরিক্ত সময় আমরা বই পড়তে, পরিবারকে দিতে, সমাজের কাজে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু প্রযুক্তি যদি আমাদের কাজের সময়ই গ্রাস করে, তাহলে প্রযুক্তির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—“এই প্রযুক্তি আমাকে কত সময় বাঁচাচ্ছে?” এবং “আমি সেই সময় কীভাবে ব্যবহার করছি?” এই দুটি প্রশ্ন আধুনিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির মূল্য কেবল তার গতি নয়; মানুষের জীবনে সে কতটা অর্থপূর্ণ সময় তৈরি করছে সেটিও তার মূল্য নির্ধারণ করে। ছবির দুই দিকের তুলনা তাই শেষ পর্যন্ত মানুষ বনাম প্রযুক্তির গল্প নয়; এটি মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের সংগ্রামের গল্প। মানুষ সবসময়ই সহজ আনন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতি এসেছে তখনই, যখন মানুষ তাৎক্ষণিক আকর্ষণের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বেছে নিয়েছে। একজন ছাত্র যদি আজ খেলতে বা বিনোদন করতে ইচ্ছা করলেও কিছু সময় পড়াশোনা করে, সে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করছে। একজন তরুণ যদি আজ অনলাইন স্বীকৃতির বদলে একটি দক্ষতা শেখে, সে ভবিষ্যতের স্বাধীনতা তৈরি করছে। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন কিছু সময় বই পড়ে, সে নিজের চিন্তার শক্তিকে বাড়াচ্ছে। আর যদি প্রযুক্তিকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করে, সে আধুনিক বিশ্বের সুযোগগুলোকে নিজের উন্নতির জন্য কাজে লাগাচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ সমাজের জন্য আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যারা প্রযুক্তিবিমুখ নয়, কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভরও নয়; যারা বইপ্রেমী, কিন্তু প্রযুক্তির সম্ভাবনাকেও গ্রহণ করে; যারা তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু তথ্যের দাস নয়; যারা অনলাইনে সক্রিয়, কিন্তু বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; যারা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করে, কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে; যারা দ্রুত তথ্য গ্রহণ করে, কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করে; যারা নতুন প্রযুক্তি শেখে, কিন্তু পুরোনো মানবিক মূল্যবোধ—সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ব ও মানবতা—ভুলে যায় না। আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে কোনো সুবিধা তার সঠিক ব্যবহারের বিকল্প নয়। বিনামূল্যে বই একটি সুযোগ; কিন্তু পড়তে হবে মানুষকেই। বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই একটি সুযোগ; কিন্তু কী দেখব তা ঠিক করতে হবে মানুষকেই। প্রযুক্তি আমাদের হাতে শক্তি তুলে দিয়েছে; এখন সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনা করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা যদি বইয়ের জ্ঞানকে ইন্টারনেটের বিস্তৃত সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তবে আধুনিক প্রযুক্তি মানবমুক্তির এক অসাধারণ হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু যদি আমরা প্রযুক্তির সুবিধার চেয়ে তার আকর্ষণের কাছে বেশি আত্মসমর্পণ করি, তাহলে একই প্রযুক্তি আমাদের সময়, মনোযোগ ও স্বাধীন সিদ্ধান্তকে দুর্বল করতে পারে। তাই ছবিটির দুই বাক্যকে একত্রে পড়লেই পূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—“জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে” এবং “আসক্তি মানুষকে দাস বানায়।” এই দুই সত্যের মাঝখানেই আধুনিক মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। আমাদের পছন্দ হতে হবে এমন একটি জীবন, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু তার ওপর বিবেকের নিয়ন্ত্রণ থাকবে; ইন্টারনেট থাকবে, কিন্তু বইয়ের গভীরতা হারিয়ে যাবে না; দ্রুততা থাকবে, কিন্তু চিন্তার ধৈর্য নষ্ট হবে না; যোগাযোগ থাকবে, কিন্তু মানবিক সম্পর্ক দুর্বল হবে না; তথ্য থাকবে, কিন্তু সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস থাকবে; বিনোদন থাকবে, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য বিনোদনে সীমাবদ্ধ হবে না। মানুষ তখনই সত্যিকারের আধুনিক, যখন সে নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজের প্রাচীন মানবিক শক্তি—চিন্তা, বিবেক, কল্পনা, সহমর্মিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ—অটুট রাখতে পারে। ভবিষ্যতের পৃথিবী আরও ডিজিটাল হবে, কিন্তু সেই পৃথিবীর মানুষকে আরও মানবিক হওয়ার প্রয়োজন হবে। কারণ মেশিন আমাদের দ্রুত করতে পারে, কিন্তু কোন দিকে দ্রুত এগোব তা নির্ধারণ করতে পারে না; তথ্য আমাদের অনেক কিছু জানাতে পারে, কিন্তু কোন জ্ঞান আমাদের জীবনে প্রয়োজন তা বেছে নিতে হয় আমাদের; ইন্টারনেট পৃথিবীকে আমাদের ঘরে এনে দিতে পারে, কিন্তু সেই পৃথিবীর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করব তা আমাদের মূল্যবোধ নির্ধারণ করবে। অতএব বইয়ের দরজা খোলা রাখতে হবে, ইন্টারনেটের দরজাও খোলা রাখতে হবে—কিন্তু দুটির সামনে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটি মানুষের নিজের হাতে রাখতে হবে। এটাই আধুনিক সময়ের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। প্রযুক্তি আমাদের সেবক হলে সভ্যতা এগিয়ে যাবে; প্রযুক্তি আমাদের প্রভু হলে মানুষ পিছিয়ে যাবে। জ্ঞানকে সামনে রেখে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করাই হতে পারে সেই ভারসাম্যের পথ, যেখানে বিনামূল্যের বই মানুষকে মুক্তির আলো দেখাবে এবং বিনামূল্যের ওয়াই-ফাই সেই আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরও প্রশস্ত করবে—আসক্তির অন্ধকারে মানুষকে হারিয়ে দেবে না।

Post a Comment

0 Comments