আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা 🎗লেখক: আব্দুল মুসরেফ খাঁন

আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা

লেখক: আব্দুল মুসরেফ খাঁন

আধুনিক সময় মানুষের জীবনে অভূতপূর্ব সুযোগ, সম্ভাবনা ও সুবিধা নিয়ে এসেছে, কিন্তু সেই সুবিধার পাশাপাশি এমন কিছু কঠিন বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে, যা আমাদের ব্যক্তি-জীবন, পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। উপস্থাপিত ছবিটির মূল বক্তব্য—একদিকে “বিনামূল্যে বই”, অন্যদিকে “বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই”; একদিকে বই মানুষের জ্ঞান বাড়িয়ে তাকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়, অন্যদিকে প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে নিজের অজান্তেই এক ধরনের নির্ভরতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারে—আধুনিক সভ্যতার এই দ্বৈত বাস্তবতাকে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরে। ছবির এক পাশে দেখা যায় একটি শান্ত, পরিচ্ছন্ন দরজা, তার পাশে বইয়ের প্রতীক এবং লেখা “বিনামূল্যে বই”; নিচে বলা হয়েছে “জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে”। অন্য পাশে দেখা যায় বিনামূল্যে ওয়াই-ফাইয়ের প্রতীক, আর তার নিচে মানুষের একটি ভিড় যেন অদৃশ্য কোনো আকর্ষণের দিকে ছুটে যাচ্ছে; নিচে লেখা—“আসক্তি মানুষকে দাস বানায়”। এই দুই দৃশ্য আসলে কেবল বই ও ইন্টারনেটের তুলনা নয়; এটি মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতার একটি গভীর সামাজিক প্রতিচ্ছবি। বই নিজে কোনো জাদুকরী বস্তু নয়, আবার ইন্টারনেটও নিজে কোনো শত্রু নয়। বিষয়টি নির্ভর করে মানুষ কোন উদ্দেশ্যে, কীভাবে এবং কতটা সচেতনতার সঙ্গে এগুলো ব্যবহার করছে তার ওপর। একটি বই মানুষকে ধৈর্য ধরে পড়তে শেখায়, একটি বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে শেখায়, যুক্তি বিশ্লেষণ করতে শেখায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করে। বই পড়ার সময় মানুষকে একটি ধারাবাহিক চিন্তার সঙ্গে থাকতে হয়। একটি অধ্যায় থেকে আরেকটি অধ্যায়, একটি যুক্তি থেকে আরেকটি যুক্তি, একটি চরিত্র থেকে আরেকটি চরিত্র—এই ধারাবাহিকতা মানুষের মস্তিষ্ককে গভীর মনোযোগের প্রশিক্ষণ দেয়। বিপরীতে ডিজিটাল জগতের অধিকাংশ বিষয় আমাদের মনোযোগকে ক্রমাগত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট, একটি সংবাদ পড়তে গিয়ে বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপন থেকে অন্য লিংক, লিংক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এইভাবে মানুষ কখন যে নিজের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তা অনেক সময় নিজেই বুঝতে পারে না। আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্যকে মানুষের কাছে অত্যন্ত দ্রুত পৌঁছে দেওয়া; কিন্তু একই শক্তি যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তবে সেটিই মানুষের মনোযোগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। আজকের শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এই ডিভাইসগুলো শিক্ষার অসাধারণ মাধ্যম হতে পারে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা, ডিজিটাল লাইব্রেরি, অনলাইন অভিধান, গবেষণাপত্র, শিক্ষামূলক ভিডিও, ভাষা শেখার প্ল্যাটফর্ম, বিজ্ঞানচর্চার উপকরণ—সবই এখন হাতের মুঠোয়। একজন প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীও চাইলে পৃথিবীর নানা দেশের জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশ করতে পারে। এই দিক থেকে প্রযুক্তি সত্যিই জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণ ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সেই সুযোগ কতটা ব্যবহার করছি? যদি বিনামূল্যে ইন্টারনেট পাওয়ার অর্থ হয় সারাদিন অর্থহীন ভিডিও দেখা, গুজব ছড়ানো, অন্যের ব্যক্তিগত জীবন অনুসরণ করা, অনলাইন বিতর্কে সময় নষ্ট করা, অশালীন বা ক্ষতিকর বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কিংবা ক্রমাগত স্ক্রল করতে থাকা, তাহলে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা জ্ঞানের মুক্তি না এনে মনোযোগের বন্দিত্ব তৈরি করতে পারে। ছবির ভিড়ের দৃশ্যটি তাই একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যায়। সেখানে মানুষ যেন কোনো দরকারি বস্তু অর্জনের জন্য নয়, বরং একটি অদৃশ্য আকর্ষণের পেছনে ছুটছে। এই অদৃশ্য আকর্ষণ হতে পারে সীমাহীন নোটিফিকেশন, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, লাইক-কমেন্টের প্রত্যাশা, নতুন ভিডিও দেখার উত্তেজনা, অনলাইন গেমের আকর্ষণ অথবা এক মুহূর্তের বিনোদনের জন্য বারবার ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম নানা ধরনের নকশা ব্যবহার করে। নতুন নোটিফিকেশন, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও, সুপারিশকৃত বিষয়, জনপ্রিয় কনটেন্ট এবং ক্রমাগত আপডেট মানুষের কৌতূহলকে সক্রিয় রাখে। ফলে অনেক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেন একটি নির্দিষ্ট কাজের উদ্দেশ্যে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখেন যে সেই উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে অন্য একটি বিষয়ের মধ্যে ডুবে গেছেন। এই পরিস্থিতি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৈশোর ও যৌবন হলো ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার সময়। এই সময় যদি প্রতিদিনের বহু ঘণ্টা অর্থহীন ডিজিটাল ব্যবহারে চলে যায়, তাহলে পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, শারীরিক ব্যায়াম, পরিবার, বন্ধু, প্রকৃতি, শিল্প, সাহিত্য এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের জন্য সময় কমে যায়। ফলে মানুষ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থেকেও বাস্তব জীবনের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এখানে বইয়ের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা দরকার। বই মানুষকে ধীর হতে শেখায়। আধুনিক দ্রুতগতির জীবনে ধীর হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। একটি ভালো বই পড়তে গেলে মানুষকে নিজের মনকে স্থির করতে হয়। সে লেখকের সঙ্গে একটি মানসিক সংলাপে প্রবেশ করে। লেখক প্রশ্ন করেন, পাঠক উত্তর খোঁজেন; লেখক একটি মত দেন, পাঠক তার সঙ্গে একমত বা দ্বিমত হন; চরিত্রের দুঃখে পাঠক সহানুভূতিশীল হন, ইতিহাসের ঘটনায় প্রশ্ন করেন, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় নতুন ধারণা লাভ করেন, দর্শনের আলোচনায় নিজের বিশ্বাসকে পুনর্বিবেচনা করেন। এই প্রক্রিয়া মানুষের চিন্তার গভীরতা বাড়ায়। তাই “জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে”—এই কথার অর্থ শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়। জ্ঞান মানুষকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ভয়, গুজব, অন্ধ অনুকরণ এবং সংকীর্ণতার হাত থেকে মুক্ত করতে পারে। একজন জ্ঞানী মানুষ সব কথা বিশ্বাস করেন না; তিনি প্রশ্ন করেন, প্রমাণ চান, তুলনা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত গড়ে তোলেন। আর একজন প্রযুক্তি-নির্ভর কিন্তু তথ্য-অসচেতন মানুষ প্রচুর তথ্যের মধ্যে থেকেও ভুল তথ্যের শিকার হতে পারেন। এখানেই আধুনিক যুগের একটি বড় বৈপরীত্য: তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক জ্ঞানের অভাব থাকতে পারে। একটি মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার তথ্য পাওয়া সম্ভব, কিন্তু কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি প্রমাণিত, কোনটি প্রচারণা এবং কোনটি উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি—তা বোঝার জন্য যে বিচারবোধ দরকার, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযুক্তি দেয় না। সেই বিচারবোধ তৈরি করতে শিক্ষা, বই, অভিজ্ঞতা, গবেষণা, যুক্তিবোধ এবং নৈতিক চর্চা দরকার। তাই ছবিটির বার্তাকে যদি গভীরভাবে পড়া যায়, তাহলে বোঝা যায় যে এটি প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান নয়; বরং প্রযুক্তিকে মানুষের অধীন রাখার আহ্বান। মানুষ প্রযুক্তির ব্যবহার করবে, প্রযুক্তি যেন মানুষের মন, সময় এবং সিদ্ধান্তের মালিক না হয়ে যায়—এই ভারসাম্যই আধুনিক সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। “বিনামূল্যে বই” এবং “বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই”—দুটিই মানুষের জন্য মূল্যবান সম্পদ হতে পারে, কিন্তু একটি আমাদের কীভাবে চিন্তা করতে হয় শেখায়, আর অন্যটি আমাদের কী চিন্তা দেখতে হবে তার অসীম দরজা খুলে দেয়। দরজা দিয়ে আমরা কোথায় প্রবেশ করব, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব মানুষের নিজের। তাই আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে—প্রযুক্তি শক্তি, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ তার দিকনির্দেশ; তথ্য সম্পদ, কিন্তু জ্ঞান তার মূল্য; ইন্টারনেট পথ, কিন্তু গন্তব্য নির্বাচন করতে হয় মানুষকেই।

আধুনিক সমাজে প্রযুক্তির বিস্তারকে কেবল ভালো বা খারাপ হিসেবে বিচার করলে বাস্তব সমস্যার সমাধান হবে না। বরং আমাদের বুঝতে হবে, প্রযুক্তির সুবিধা ও ঝুঁকি একই সঙ্গে বিদ্যমান এবং তার ফল নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য, শিক্ষা, মানসিক প্রস্তুতি, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির নকশার ওপর। ইন্টারনেট শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, যোগাযোগ, গবেষণা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন এনেছে। একজন কৃষক আবহাওয়ার তথ্য পেতে পারেন, একজন ছাত্র অনলাইন ক্লাস করতে পারেন, একজন চাকরিপ্রার্থী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পেতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা বিশ্বের বাজারে নিজের পণ্য পৌঁছে দিতে পারেন, একজন গবেষক দূরদেশের গবেষণাপত্র পড়তে পারেন, একজন প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কল করতে পারেন। বিপদের সময় দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করা যায়, দুর্যোগের খবর ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সরকারি পরিষেবার তথ্য পাওয়া যায় এবং দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। এই সম্ভাবনাগুলোকে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের মনোযোগকে একটি মূল্যবান পণ্যে পরিণত করেছে। যে প্ল্যাটফর্ম যত বেশি সময় ব্যবহারকারীকে ধরে রাখতে পারে, সে তত বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। ফলে ব্যবহারকারীর উপকারের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক স্বার্থ সবসময় এক নয়। একজন মানুষ হয়তো পাঁচ মিনিটের জন্য একটি তথ্য খুঁজতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বিভিন্ন সুপারিশ ও নোটিফিকেশন তাকে আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা ধরে আটকে রাখতে পারে। এই অবস্থায় “বিনামূল্যে” শব্দটির অর্থ নিয়েও চিন্তা করা দরকার। কোনো পরিষেবা অর্থ না নিয়েও যদি মানুষের সময়, মনোযোগ, তথ্য বা আচরণগত তথ্যের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ অর্থে বিনামূল্যে কি না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন। ছবিতে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাইয়ের দিকে মানুষের যে তীব্র আকর্ষণ দেখানো হয়েছে, তা এই বৃহত্তর বাস্তবতার একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক হিসেবে পড়া যায়। বিনামূল্যে পাওয়া জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ স্বাভাবিক। কিন্তু “বিনামূল্যে” শব্দটি অনেক সময় আমাদের বিচারবোধকে দুর্বল করে। আমরা ভাবি, যেহেতু টাকা দিতে হচ্ছে না, তাই ক্ষতিও নেই। অথচ সময়ের ক্ষতি, মনোযোগের ক্ষতি, ঘুমের ক্ষতি, বাস্তব সম্পর্কের ক্ষতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক অস্থিরতা এবং ভুল তথ্যের প্রভাব—এসবের মূল্য অনেক বড় হতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের আত্মমূল্যবোধেও প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে করা, লাইক বা মন্তব্যের সংখ্যা দিয়ে নিজের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিচার করা, ক্রমাগত তুলনা করা, অনলাইন স্বীকৃতি না পেলে হতাশ হওয়া—এসব আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতির পরিচিত সমস্যা। এখানে বই আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সাধারণত তাৎক্ষণিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। একটি বই পড়ে কেউ কতটি লাইক পেলেন, কতজন মন্তব্য করলেন, কতজন তাকে অনুসরণ করলেন—এসব প্রশ্ন থাকে না। পাঠকের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যক্তিগত এবং গভীর। বই মানুষকে নিজের ভেতরের জগতের সঙ্গে পরিচয় করায়। সাহিত্য মানুষের অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে, ইতিহাস অতীতকে বোঝায়, বিজ্ঞান প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করে, দর্শন প্রশ্ন করতে শেখায়, জীবনী সংগ্রাম থেকে শিক্ষা দেয়, সমাজবিজ্ঞান সমাজের কাঠামো বিশ্লেষণ করে এবং অর্থনীতি মানুষের সম্পদ ও সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে। তাই বই কেবল কাগজের পৃষ্ঠা নয়; বই হলো বহু প্রজন্মের চিন্তার সংরক্ষিত অভিজ্ঞতা। একটি ভালো বই পড়ার অর্থ হলো এমন একজন মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করা, যিনি হয়তো শত বছর আগে বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তার চিন্তা আজও আমাদের প্রশ্ন করতে পারে। এই কারণেই বিদ্যালয়, কলেজ, গ্রন্থাগার এবং পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “বিনামূল্যে বই” যদি সত্যিই মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে তা সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করতে পারে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান, প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্র, শ্রমজীবী পরিবারের তরুণ কিংবা শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা মানুষ একটি বইয়ের মাধ্যমে এমন জগতে প্রবেশ করতে পারেন, যেখানে অর্থনৈতিক বাধা অনেকটাই কমে যায়। একটি বই হয়তো একজন ছাত্রের পরীক্ষার ফল বদলে দিতে পারে; একটি জীবনী তার পেশাগত স্বপ্ন তৈরি করতে পারে; একটি বিজ্ঞান বই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে; একটি ইতিহাসের বই নিজের সমাজ ও দেশের অতীত সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে পারে; একটি সাহিত্যকর্ম মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। এই অর্থে বইয়ের সামাজিক শক্তি অপরিসীম। কিন্তু বই পড়ার সংস্কৃতিও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেকেই বলেন, তরুণরা বই পড়ে না; কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। তরুণরা পড়ে, তবে অনেক সময় তাদের পাঠের মাধ্যম বদলে গেছে। তারা ফোনে নিবন্ধ, ই-বুক, ডিজিটাল কমিকস, ব্লগ, অনলাইন নোট এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক উপাদান পড়ে। তাই সমাধান হিসেবে শুধু “ফোন ছেড়ে বই পড়ো” বলা যথেষ্ট নয়। বরং ডিজিটাল প্রযুক্তিকেও জ্ঞানচর্চার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। একটি স্মার্টফোনে ই-বুক রাখা যায়, অডিওবুক শোনা যায়, অনলাইন লাইব্রেরি ব্যবহার করা যায়, শিক্ষামূলক কোর্স করা যায় এবং গবেষণার তথ্য খোঁজা যায়। মূল বিষয় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার যেন উদ্দেশ্যনির্ভর হয়। যদি একজন শিক্ষার্থী ফোন খুলে নির্দিষ্ট অধ্যায়ের ভিডিও দেখে, নোট তৈরি করে, অভিধান ব্যবহার করে এবং তারপর ফোন বন্ধ করে পড়াশোনায় ফিরে যায়, তাহলে ফোন তার দাসত্বের কারণ নয়, বরং শিক্ষার সহায়ক। কিন্তু যদি একই শিক্ষার্থী পড়ার মাঝখানে বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে, ভিডিও স্ক্রল করে, অনলাইন গেম খেলে এবং কয়েক ঘণ্টা পর বুঝতে পারে যে পড়ার কাজ হয়নি, তাহলে প্রযুক্তি তার উদ্দেশ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই পার্থক্য বোঝাতে “ডিজিটাল শৃঙ্খলা” অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের সদস্যদেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। সন্তানকে শুধু ফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করলেই হবে না; বড়দের নিজেদের আচরণেও উদাহরণ তৈরি করতে হবে। বাবা-মা যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, অথচ সন্তানকে ফোন কম ব্যবহার করতে বলেন, তাহলে সেই নির্দেশ কার্যকর হওয়া কঠিন। পরিবারে নির্দিষ্ট সময়ে ফোন-মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে; খাবারের টেবিলে ফোন না রাখা, ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করা এবং বাইরে হাঁটা বা খেলাধুলার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। বিদ্যালয়েও শুধু পাঠ্যবই নয়, “ডিজিটাল সাক্ষরতা” ও “মিডিয়া সাক্ষরতা” শেখানো দরকার। ছাত্রদের শেখাতে হবে কীভাবে অনলাইন তথ্য যাচাই করতে হয়, ভুয়া ছবি ও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম চিনতে হয়, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হয়, অনলাইন প্রতারণা থেকে সাবধান থাকতে হয় এবং মতের পার্থক্যকে সম্মান করতে হয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে নৈতিকতা যুক্ত না হলে দক্ষতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। একজন দক্ষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যদি মিথ্যা তথ্য ছড়ান, অন্যকে অপমান করেন, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করেন বা ঘৃণা ছড়ান, তাহলে তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা সমাজের জন্য উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি তৈরি করবে। তাই আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “ডিজিটালভাবে দক্ষ” মানুষ তৈরি করা নয়; বরং “ডিজিটালভাবে দায়িত্বশীল” মানুষ তৈরি করা। আমাদের বুঝতে হবে, স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই করা নয়; স্বাধীনতা মানে নিজের সিদ্ধান্তের ফল সম্পর্কে সচেতন থাকা। একটি শিশু যদি নিজেই বুঝতে শেখে কখন ফোন ব্যবহার করতে হবে এবং কখন ফোন সরিয়ে রাখতে হবে, তাহলে সে সত্যিকারের ডিজিটাল স্বাধীনতার পথে এগোবে। এই শিক্ষা পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তাই প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। ছবির দুই পাশ তাই পরস্পরের শত্রু নয়; বরং তারা আমাদের সামনে দুটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ তুলে ধরে। একদিকে জ্ঞান, ধৈর্য, চিন্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুক্তির পথ; অন্যদিকে অসচেতন ব্যবহার, অতিরিক্ত নির্ভরতা, মনোযোগের বিভাজন ও আসক্তির পথ। কোন পথ বেছে নেব, সেটিই আমাদের সভ্যতার পরীক্ষার বিষয়।

শেষ পর্যন্ত আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতা হলো—আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে জ্ঞানের দরজা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি খোলা, কিন্তু একই সঙ্গে বিভ্রান্তির দরজাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রশস্ত। আমাদের হাতে বই আছে, আবার সীমাহীন ইন্টারনেটও আছে; আমাদের কাছে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু মনোযোগের অভাব বাড়ছে; যোগাযোগের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গভীর মানবিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে; মানুষের হাতে প্রযুক্তির শক্তি বেড়েছে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনও একই সঙ্গে বেড়েছে। তাই ছবিটির “জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে” এবং “আসক্তি মানুষকে দাস বানায়”—এই দুই বাক্যকে আধুনিক জীবনের দুটি মৌলিক শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। জ্ঞান মানুষকে মুক্ত করে কারণ জ্ঞান মানুষকে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ বুঝতে সাহায্য করে। একজন জ্ঞানী মানুষ জানেন যে সব জনপ্রিয় কথা সত্য নয়, সব ভাইরাল ভিডিও বিশ্বাসযোগ্য নয়, সব সুন্দর ছবি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি নয় এবং সব অনলাইন মতামত বিশেষজ্ঞের মতামত নয়। তিনি উৎস যাচাই করেন, যুক্তি খোঁজেন, নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখেন এবং নতুন তথ্য পেলে নিজের ধারণা পরিবর্তন করার সাহস রাখেন। এই ধরনের জ্ঞান শুধু বই থেকে আসে না; বই তার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা, শিক্ষক, গবেষণা, আলোচনা, পর্যবেক্ষণ এবং চিন্তার মধ্য দিয়েও জ্ঞান তৈরি হয়। তবে বই মানুষের এই বৌদ্ধিক যাত্রাকে সুসংগঠিত করে। একটি সমাজে যদি পাঠাভ্যাস কমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রত্যেক পরিবারে একটি ছোট বইয়ের তাক, প্রত্যেক বিদ্যালয়ে সক্রিয় গ্রন্থাগার, প্রত্যেক অঞ্চলে সহজলভ্য পাঠাগার এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বই পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা দরকার। “বিনামূল্যে বই” শুধু একটি দান নয়; এটি ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করার বিনিয়োগ। একটি শিশুকে একটি ভালো বই দেওয়া মানে তার হাতে একটি প্রশ্ন দেওয়া, একটি কল্পনার জগৎ দেওয়া, একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া। একইভাবে “বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই”ও যদি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি জ্ঞানের বিশাল মহাসড়ক হতে পারে। সরকারি বিদ্যালয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট থাকলে ছাত্ররা অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারে; গ্রন্থাগারে ইন্টারনেট থাকলে গবেষণা সহজ হয়; গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল সংযোগ থাকলে মানুষ সরকারি পরিষেবা ও কর্মসংস্থানের তথ্য পেতে পারে; কৃষক বাজারদর ও আবহাওয়ার তথ্য পেতে পারেন; ছোট ব্যবসায়ী অনলাইন বাজারে প্রবেশ করতে পারেন। অর্থাৎ ওয়াই-ফাই নিজে মানুষকে দাস বানায় না; অসচেতনতা, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটাল আচরণ মানুষকে দাসত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই ছবিটির বক্তব্যকে প্রযুক্তিবিরোধী প্রচারণা হিসেবে দেখলে তার গভীরতা নষ্ট হবে। বরং এটি প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের আহ্বান। আমাদের এমন একটি সমাজ দরকার যেখানে শিশুদের বলা হবে—ইন্টারনেট ব্যবহার করো, কিন্তু ইন্টারনেট যেন তোমাকে ব্যবহার না করে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করো, কিন্তু নিজের আত্মমূল্যবোধকে লাইক-কমেন্টের ওপর নির্ভর করো না; ভিডিও দেখো, কিন্তু নিজের জীবনের সময়কে অসীম স্ক্রলের হাতে তুলে দিও না; অনলাইন বন্ধুত্ব করো, কিন্তু বাস্তব সম্পর্কের গুরুত্ব ভুলে যেও না; প্রযুক্তি শেখো, কিন্তু মানুষের প্রতি সহানুভূতি হারিয়ো না; তথ্য সংগ্রহ করো, কিন্তু যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করো না। আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় দক্ষতা সম্ভবত “কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়” নয়, বরং “কখন প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে হয়”—এই সিদ্ধান্ত নিতে পারা। কারণ প্রযুক্তির যুগে মনোযোগ একটি বিরল সম্পদ। যে ব্যক্তি নিজের মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তিনি নিজের সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন; যে নিজের সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তিনি নিজের জীবনের অনেক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তাই আত্মনিয়ন্ত্রণ আধুনিক যুগে একটি নৈতিক ও ব্যবহারিক শক্তি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বই পড়া, নির্দিষ্ট সময় অনলাইন কাজ করা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, পড়াশোনার সময় ফোন দূরে রাখা, ঘুমের আগে ডিজিটাল ব্যবহার কমানো, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো—এসব ছোট অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার উত্তর শেখাবেন না; তাদের মনোযোগের মূল্য, তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারও শেখাবেন। অভিভাবকেরা সন্তানের ওপর কেবল নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন। সমাজে বইমেলা, পাঠচক্র, গ্রন্থাগার, বিতর্কসভা, বিজ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। কারণ মানুষকে যদি অর্থপূর্ণ বিকল্প না দেওয়া হয়, তাহলে শূন্য সময় সহজেই অ্যালগরিদমের দখলে চলে যেতে পারে। একজন তরুণ যদি খেলাধুলা, বই, সংগীত, বিজ্ঞান, শিল্প, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে তার ডিজিটাল জীবনের ভারসাম্যও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। একইভাবে রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ, তথ্যের গোপনীয়তা, অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধ, সাইবার হয়রানি মোকাবিলা এবং ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিক নকশা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারকারীর মনোযোগ কেবল ব্যবসায়িক লাভের জন্য সীমাহীনভাবে আটকে রাখার পরিবর্তে প্রযুক্তি এমনভাবে তৈরি করা উচিত, যাতে মানুষ তার নিজের সময় ও গোপনীয়তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। সমাজের দরকার এমন প্রযুক্তি যা মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়, মানুষের দুর্বলতাকে শোষণ করে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, সভ্যতার অগ্রগতি শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট, শক্তিশালী কম্পিউটার বা উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করে না; সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে মানুষ এই শক্তিগুলো কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে তার ওপর। প্রযুক্তি যদি শিক্ষাকে সহজ করে, রোগীর সেবা উন্নত করে, কৃষকের জীবন সহজ করে, কর্মসংস্থান তৈরি করে, দূরত্ব কমায় এবং জ্ঞানকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়, তাহলে তা মানবমুক্তির শক্তি। কিন্তু প্রযুক্তি যদি মানুষের সময় গ্রাস করে, মিথ্যা তথ্য ছড়ায়, ঘৃণা বাড়ায়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করে, শিশুর মনোযোগ দুর্বল করে এবং মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তাহলে তার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তাই আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন “বই না ইন্টারনেট”—এটি নয়; আসল প্রশ্ন হলো “জ্ঞান না আসক্তি?” একটি বইও মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে যদি সেটি অন্ধভাবে পড়া হয়, আবার ইন্টারনেটও মানুষকে জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে পারে যদি তা সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং বই ও ইন্টারনেটের মধ্যে সংঘাত তৈরি করার বদলে তাদের সঠিক সমন্বয় করা দরকার। একটি শিশু বই পড়বে, তারপর প্রয়োজনে ইন্টারনেটে অতিরিক্ত তথ্য খুঁজবে; একজন ছাত্র পাঠ্যবই পড়ে অনলাইন বক্তৃতা শুনবে; একজন গবেষক গ্রন্থাগারের বই এবং ডিজিটাল গবেষণার তথ্য একত্রে ব্যবহার করবেন; একজন সাধারণ নাগরিক অনলাইন সংবাদ পড়বেন, কিন্তু একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসে যাচাই করবেন। এই সমন্বিত ব্যবহারই হতে পারে ভবিষ্যৎ শিক্ষার পথ। ছবির দরজাটি তাই কেবল একটি কাঠের দরজা নয়; এটি জ্ঞানের প্রতীক। আর ওয়াই-ফাইয়ের চিহ্নটি কেবল ইন্টারনেটের প্রতীক নয়; এটি আধুনিক মানুষের সামনে খোলা অসীম সম্ভাবনার প্রতীক। দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে আমরা কোন ঘরে যাব, সেটি নির্ভর করে আমাদের উদ্দেশ্যের ওপর। একইভাবে ইন্টারনেটের বিশাল জগতে প্রবেশ করে আমরা জ্ঞান খুঁজব, নাকি আসক্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাব—সেটিও নির্ভর করে আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর। তাই আধুনিক সময়ের কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন একটি নীতি গ্রহণ করা উচিত: প্রযুক্তি আমাদের হাতের যন্ত্র হবে, জীবনের নিয়ন্ত্রক নয়; তথ্য হবে জ্ঞানের উপকরণ, বিভ্রান্তির অস্ত্র নয়; বই হবে চিন্তার সঙ্গী, আর ইন্টারনেট হবে অনুসন্ধানের মাধ্যম। মানুষকে মুক্ত করার জন্য জ্ঞান দরকার, আর জ্ঞানকে কাজে লাগানোর জন্য বিবেক দরকার। সেই বিবেকই আমাদের শেখাবে কখন পড়তে হবে, কখন অনুসন্ধান করতে হবে, কখন প্রশ্ন করতে হবে, কখন ফোন বন্ধ করতে হবে এবং কখন বাস্তব মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আধুনিকতার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন প্রযুক্তি আমাদের মানুষত্বকে শক্তিশালী করবে, দুর্বল করবে না। বিনামূল্যের বই যদি একটি শিশুর হাতে স্বপ্ন তুলে দেয় এবং বিনামূল্যের ইন্টারনেট যদি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জ্ঞান ও সুযোগ দেয়, তাহলে দুটিই মানবমুক্তির শক্তি। কিন্তু যদি আমরা জ্ঞানের পরিবর্তে কেবল বিনোদন, চিন্তার পরিবর্তে কেবল স্ক্রল, বাস্তব সম্পর্কের পরিবর্তে কেবল ভার্চুয়াল স্বীকৃতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে অন্ধ আসক্তিকে বেছে নিই, তাহলে আমাদের হাতে থাকা প্রযুক্তিই আমাদের সময় ও স্বাধীনতার ওপর অদৃশ্য শৃঙ্খল তৈরি করবে। অতএব ছবিটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো—বস্তু বিনামূল্যে হতে পারে, কিন্তু তার ব্যবহার কখনো মূল্যহীন নয়; বইয়ের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না, আর ইন্টারনেটের মূল্য শুধু ডেটার পরিমাণে নির্ধারিত হয় না। মানুষের প্রকৃত সম্পদ হলো তার জ্ঞান, সময়, মনোযোগ, বিবেক ও স্বাধীন চিন্তা। এই সম্পদকে রক্ষা করাই আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আমরা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা প্রযুক্তি জানবে কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না; বই পড়বে কিন্তু কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, জীবন বোঝার জন্য; ইন্টারনেট ব্যবহার করবে কিন্তু নিজের সময়ের মালিক থাকবে; তথ্য সংগ্রহ করবে কিন্তু সত্য যাচাই করবে; মত প্রকাশ করবে কিন্তু অন্যের মর্যাদা রক্ষা করবে; এবং সর্বোপরি জ্ঞানকে ব্যবহার করবে মানুষের মুক্তি, সমাজের উন্নতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের জন্য। সেই সমাজেই “বিনামূল্যে বই” সত্যিকার অর্থে মুক্তির দরজা খুলবে এবং “বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই” হয়ে উঠবে জ্ঞানের সেতু—আসক্তির ফাঁদ নয়।

Post a Comment

0 Comments