'শান-এ-নুজুল': বিস্তারিত ব্যাখ্যা: প্রতিটি সূরার প্রেক্ষাপট
কুরআনুল কারীমের প্রতিটি সূরার অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু প্রেক্ষাপট বা কারণ থাকে, যাকে ইসলামী পরিভাষায় 'শান-এ-নুজুল' বলা হয়। এটি মূলত কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, কোনো প্রশ্নের উত্তর বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর নিকট বাণী প্রেরণের প্রেক্ষাপট।
১. সূরা আল-ফাতিহা (সূচনা)
প্রেক্ষাপট: এই সূরাটি পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে সর্বপ্রথম নাজিল হয়। নবী করীম (সা.) যখন নির্জনে থাকতেন, তখন তিনি অদৃশ্য থেকে 'ইয়া মুহাম্মদ' ডাক শুনতে পেতেন। তিনি ভয় পেয়ে গেলে ওয়ারাকা বিন নওফেল তাকে আশ্বস্ত করেন। পরবর্তীতে জিবরাঈল (আ.) এসে তাকে এই সূরাটি শিক্ষা দেন। এটি মূলত বান্দা এবং আল্লাহর মধ্যে একটি কথোপকথন ও প্রার্থনার সূরা।
২. সূরা আল-ফীল (হস্তীবাহিনী)
প্রেক্ষাপট: রাসূল (সা.)-এর জন্মের বছর ইয়েমেনের আবরাহা নামক এক খ্রিষ্টান রাজা হাতি নিয়ে পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করতে মক্কায় আক্রমণ করেছিল। আল্লাহ তায়ালা ঝাঁকে ঝাঁকে 'আব্যাবিল' পাখি পাঠিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করে দেন। মক্কাবাসীদের কাছে এই ঘটনা ছিল অত্যন্ত পরিচিত। কুরাইশদের আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে এই সূরা নাজিল হয়।
৩. সূরা আল-কাওসার (প্রাচুর্য)
প্রেক্ষাপট: রাসূল (সা.)-এর পুত্রসন্তান ইব্রাহিম (রা.) যখন মারা যান, তখন মক্কার কাফেররা (বিশেষ করে আস বিন ওয়ায়েল) নবীজিকে 'আবতার' বা 'নির্বংশ' বলে উপহাস করতে থাকে। তাদের ধারণা ছিল, তার কোনো ছেলে নেই বলে তার নাম নেওয়ার কেউ থাকবে না। তাদের এই হীন মানসিকতার জবাবে আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে সান্ত্বনা দিয়ে এই সূরা নাজিল করেন এবং ঘোষণা করেন যে, নবীজি নন বরং তার শত্রুরাই হবে নির্বংশ।
৪. সূরা আল-লাহাব (অগ্নিশিখা)
প্রেক্ষাপট: সাফা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে যখন রাসূল (সা.) মক্কাবাসীদের এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিলেন, তখন তার আপন চাচা আবু লাহাব অত্যন্ত অভদ্রভাবে বলে ওঠে, "ধ্বংস হোক তোমার! তুমি কি একারণেই আমাদের ডেকেছিলে?" চাচার এই ধৃষ্টতা ও শত্রুতার জবাবে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ধ্বংসের সংবাদ দিয়ে এই সূরাটি নাজিল করেন।
৫. সূরা আল-ইখলাস (একত্ববাদ)
প্রেক্ষাপট: মক্কার মুশরিকরা রাসূল (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিল, "আপনার রবের বংশ পরিচয় বা বংশলতিকা কী? তিনি কিসের তৈরি (স্বর্ণ না কি রূপার)?" তাদের এই অবান্তর ও মূর্খতাসুলভ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তায়ালা নিজের বিশুদ্ধ একত্ববাদের পরিচয় দিয়ে এই সূরাটি নাজিল করেন।
উপকারিতা:
·
সঠিক অর্থ অনুধাবন: প্রেক্ষাপট জানলে আয়াতের আসল উদ্দেশ্য বোঝা সহজ হয়।
·
ঐতিহাসিক জ্ঞান: ইসলামের প্রাথমিক যুগের চ্যালেঞ্জ ও অলৌকিক ঘটনাগুলো জানা যায়।
সূরা আল-বাকারা (সবচেয়ে বড় সূরা) কিংবা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় নিচের সূরাগুলো থেকে কোনোটির প্রেক্ষাপট বা শান-এ-নুজুল :
১. সূরা আল-ইমরান: বিশেষ করে নাজরান থেকে আসা খ্রিস্টান প্রতিনিধিদের সাথে নবীজির (সা.) বিতর্কের প্রেক্ষাপট।
২. সূরা আল-কাহাফ: কেন আসহাবে কাহাফের গুহাবাসী যুবক, খিজির (আ.) এবং যুলকারনাইন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল?
৩. সূরা আল-কদর: কেন লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা হলো?
৪. সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস: নবীজির (সা.) ওপর যে জাদুটোনা করা হয়েছিল, তার থেকে মুক্তির প্রেক্ষাপট।
৫. সূরা আদ-দোহা: যখন ওহী আসা দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল এবং কাফেররা নবীজিকে উপহাস করছিল।
সূরা আদ-দোহা (الضحى)।
এই সূরাটি কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে নাজিল হয়েছিল, তা জানলে মুমিন হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভূত হয়। নিচে এর বিস্তারিত শান-এ-নুজুল তুলে ধরছি:
সূরা আদ-দোহা
প্রেক্ষাপট (শান-এ-নুজুল):
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহী বা আল্লাহর বাণী আসা শুরু হওয়ার পর হঠাৎ একটি সময় বিরতি দেখা দেয়। বেশ কিছুকাল (মতান্তরে ১৫ দিন বা তার বেশি) জিবরাঈল (আ.) কোনো ওহী নিয়ে আসেননি। এই নীরবতাকে কেন্দ্র করে মক্কার কাফেররা এবং বিশেষ করে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল নবীজিকে (সা.) উপহাস করতে শুরু করে।
তারা বলতে লাগল:
"মুহাম্মদের রব তাকে ত্যাগ করেছেন এবং তার ওপর রাগান্বিত হয়েছেন (মা ওয়াকদ্দাআকা রাব্বুকা ওয়া মা কালা)।"
এই বিদ্রূপ এবং ওহী না আসার কারণে রাসূল (সা.) অত্যন্ত ব্যথিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবছিলেন, হয়তো তার কোনো ত্রুটির কারণে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। নবীজির এই মানসিক কষ্ট ও কাফেরদের অপবাদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে আল্লাহ তায়ালা এই সূরাটি নাজিল করেন।
সূরার মূল বক্তব্য ও সান্ত্বনা:
১. আল্লাহ তায়ালা দিনের আলো এবং রাতের নিস্তব্ধতার কসম খেয়ে বলেন যে, তিনি তাঁর নবীকে ছেড়ে যাননি এবং তাঁর ওপর অসন্তুষ্টও হননি।
২. আল্লাহ নবীজিকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাঁর শৈশবে যখন তিনি এতিম ছিলেন, আল্লাহই তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। যখন তিনি পথ খুঁজছিলেন, আল্লাহই তাকে পথ দেখিয়েছেন।
৩. শেষে নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তিনি এতিম ও সাহায্যপ্রার্থীদের সাথে সদয় ব্যবহার করেন এবং আল্লাহর নেয়ামতের কথা প্রচার করেন।
সূরা আল-ইনশিরাহ (الم نشرح) এবং সূরা
আদ-দোহা যেন একে অপরের পরিপূরক। সূরা আদ-দোহাতে আল্লাহ
তায়ালা নবীজিকে (সা.) আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি তাকে
ত্যাগ করেননি, আর সূরা আল-ইনশিরাহ-তে আল্লাহ নবীজির
অন্তরের বিশালতা এবং তাঁর মর্যাদাকে আকাশচুম্বী করার ঘোষণা দিয়েছেন।
নিচে এই সূরার বিস্তারিত
প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা তুলে
ধরছি:
সূরা আল-ইনশিরাহ (বক্ষ
প্রশস্তকরণ)
প্রেক্ষাপট
(শান-এ-নুজুল): ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে মক্কার কাফেররা যখন নবীজিকে (সা.) নানাভাবে কষ্ট দিচ্ছিল, মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিল এবং উপহাস করছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই নবীজি মানসিকভাবে খুব বিষণ্ণ ও ভারাক্রান্ত হয়ে
পড়েছিলেন। প্রচারের দায়িত্বের বিশাল বোঝা এবং শত্রুদের আক্রমণ—সব মিলিয়ে তিনি
যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই অস্থিরতা দূর করতেই এই সূরাটি নাজিল
হয়।
সূরার
৪টি প্রধান দিক ও সান্ত্বনা:
১. বক্ষ
প্রশস্তকরণ (الم
نشرح لك صدرك): আল্লাহ
বলছেন, "আমি কি আপনার বক্ষকে
প্রশস্ত করে দেইনি?" এর অর্থ হলো
নবীজিকে ধৈর্য, জ্ঞান এবং সাহসের এমন এক বিশালতা দান
করা হয়েছে যাতে তিনি জগতের সকল অপমান ও কষ্ট সহ্য
করে ইসলামের দাওয়াত চালিয়ে যেতে পারেন। (অনেকের মতে, এটি নবীজির শৈশবে ফেরেশতাদের মাধ্যমে 'বক্ষ বিদীর্ণ' করার অলৌকিক ঘটনার দিকেও ইঙ্গিত করে)।
২. বোঝা
লাঘব করা (ووضعنا عنك وزرك):
নবুওয়াতের গুরুভার এবং মক্কার কুরাইশদের অসহযোগিতা নবীজির পিঠকে যেন ভেঙে দিচ্ছিল। আল্লাহ এই সূরা নাজিল
করে ঘোষণা করলেন যে, তিনি নবীজির সেই দুশ্চিন্তার বোঝা হালকা করে দিয়েছেন।
৩. মর্যাদা
বৃদ্ধি (ورفعنا
لك ذكرك): কাফেররা
চেয়েছিল নবীজির নাম মুছে দিতে, কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা করলেন, "আমি আপনার স্মরণকে (নামকে) উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।" আজ আজানের প্রতিটি
ধ্বনিতে এবং নামাজের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর নামের সাথে নবীজির নাম উচ্চারিত হচ্ছে—যা এই আয়াতের
বাস্তব প্রতিফলন।
৪. কষ্টের
সাথেই স্বস্তি (ان مع العسر يسرا):
আল্লাহ দুবার জোর দিয়ে বলেছেন—"নিশ্চয় কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।" এটি মুমিনদের জন্য এক বিরাট আশার
বাণী যে, বিপদের মেঘ কেটে গেলেই সুখের সূর্য উদিত হবে।
একটি বিশেষ শিক্ষা:
এই সূরার শেষ
দিকে আল্লাহ নবীজিকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যখনই তিনি দাওয়াতের কাজ বা দুনিয়াবী দায়িত্ব
থেকে অবসর পাবেন, তখনই যেন তিনি একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। অর্থাৎ, প্রশান্তির একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর সান্নিধ্য।
সূরা আল-কাহাফের অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট বা শান-এ-নুজুল আলোচনা করা হলো:
সূরা আল-কাহাফ (গুহা)
১. প্রেক্ষাপট (শান-এ-নুজুল)
মক্কার কুরাইশরা যখন দেখল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াত দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য একটি বুদ্ধি আঁটল। তারা নযর বিন হারিস এবং উকবা বিন আবু মুআইতকে মদিনার ইহুদি পন্ডিতদের কাছে পাঠাল। কারণ ইহুদিরা পূর্ববর্তী কিতাব ও নবীদের সম্পর্কে জানত।
ইহুদি পন্ডিতরা তাদের শিখিয়ে দিল যে, "তোমরা মুহাম্মদকে গিয়ে তিনটি প্রশ্ন করো। যদি তিনি এগুলোর সঠিক উত্তর দিতে পারেন, তবে বুঝবে তিনি সত্যিই আল্লাহর নবী। আর যদি না পারেন, তবে বুঝবে তিনি একজন মিথ্যাবাদী।"
সেই তিনটি প্রশ্ন ছিল:
- সেই যুবকদের ঘটনা কী ছিল, যারা প্রাচীনকালে তাদের জনপদ ছেড়ে চলে গিয়েছিল (আসহাবে কাহাফ)?
- সেই ব্যক্তির কাহিনী কী, যিনি পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন (যুলকারনাইন)?
- 'রুহ' বা আত্মা কী?
২. ওহী নাজিলের ঘটনা
কুরাইশরা ফিরে এসে নবীজিকে (সা.) এই প্রশ্নগুলো করল। নবীজি (সা.) আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, "আমি আগামীকাল তোমাদের উত্তর দেব।" কিন্তু তিনি তখন 'ইনশাআল্লাহ' (যদি আল্লাহ চান) বলতে ভুলে গিয়েছিলেন।
ফলশ্রুতিতে, দীর্ঘ ১৫ দিন পর্যন্ত কোনো ওহী নাজিল হলো না। জিবরাঈল (আ.)-ও এলেন না। মক্কার কাফেররা হাসি-ঠাট্টা শুরু করল যে, মুহাম্মদের রব তাঁকে ত্যাগ করেছেন। নবীজি (সা.) অত্যন্ত ব্যথিত ও লজ্জিত হলেন। অবশেষে ১৫ দিন পর জিবরাঈল (আ.) সূরা আল-কাহাফ নিয়ে নাজিল হলেন, যেখানে প্রথম দুটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো। (আর 'রুহ' সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর সূরা বনী ইসরাঈলে দেওয়া হয়েছে)।
৩. সূরার মূল শিক্ষা
এই সূরায় চারটি প্রধান শিক্ষণীয় কাহিনী রয়েছে:
- আসহাবে কাহাফ: ঈমান রক্ষার জন্য গুহায় আশ্রয় নেওয়া যুবকদের ৩০০ বছরের বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকার ঘটনা।
- দুই বাগানের মালিকের কাহিনী: যা মানুষের অহংকার ও সম্পদের তুচ্ছতা প্রকাশ করে।
- মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর সফর: যা আল্লাহর গায়েবী হিকমত বা প্রজ্ঞা বুঝতে সাহায্য করে।
- যুলকারনাইন ও ইয়াজুজ-মাজুজ: ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার এবং পৃথিবীর প্রান্তসীমা ভ্রমণের ইতিহাস।
একটি বিশেষ তথ্য:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা আল-কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে অন্য জুমা পর্যন্ত নূর (আলো) চমকাতে থাকবে এবং এটি দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি বড় মাধ্যম।
সূরা আল-ফীল
১. প্রেক্ষাপট ও শান-এ-নুজুল
এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়। এর মূল প্রেক্ষাপট হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের মাত্র ৫০-৫৫ দিন আগের একটি ঘটনা। ইয়েমেনের তৎকালীন খ্রিষ্টান গভর্নর আবরাহা লক্ষ্য করলেন যে, আরবের লোকেরা প্রতিবছর মক্কার কাবার দিকে ছুটে যায়। তিনি চাইলেন আরবরা মক্কায় না গিয়ে ইয়েমেনে আসুক।
তাই তিনি ইয়েমেনের রাজধানী সানায় 'কালাইস' নামে একটি বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ গির্জা তৈরি করেন। কিন্তু আরবরা তাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মৃতিধন্য কাবাকে ছেড়ে সেখানে যেতে রাজি হলো না। এমনকি জনশ্রুতি আছে, এক আরব ব্যক্তি ক্ষোভে সেই গির্জায় গিয়ে নোংরামি করে আসে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আবরাহা কসম খেলেন যে, তিনি মক্কার পবিত্র কাবা ঘরটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন।
২. আক্রমণের বিবরণ
আবরাহা ৬০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী এবং ৯টি (মতান্তরে ১৩টি) হাতি নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হলেন। তার বাহিনীর প্রধান হাতির নাম ছিল 'মাহমুদ'। মক্কায় পৌঁছে আবরাহা কুরাইশ নেতা ও নবীজির দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ২০০ উট ছিনিয়ে নেন। আব্দুল মুত্তালিব যখন তার উট ফেরত চাইতে গেলেন, আবরাহা অবাক হয়ে বললেন, "আমি আপনার ধর্মালয় ধ্বংস করতে এসেছি, আর আপনি উটের চিন্তা করছেন?" আব্দুল মুত্তালিব উত্তর দিয়েছিলেন, "উটগুলো আমার, তাই আমি সেগুলোর মালিক। আর এই ঘরের (কাবার) একজন মালিক আছেন, তিনিই এটি রক্ষা করবেন।"
৩. আল্লাহর কুদরত ও আবাবিল পাখি
আবরাহা যখন কাবা ধ্বংসের জন্য চূড়ান্ত আদেশ দিলেন, তখন প্রধান হাতি 'মাহমুদ' মক্কার দিকে এক কদমও এগোলো না। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, কিন্তু তাকে ইয়েমেনের দিকে মুখ করালে সে দৌড়াতে শুরু করত।
ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে 'আবাবিল' পাখি পাঠালেন। প্রতিটি পাখির মুখে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে মোট তিনটি কঙ্কর (পাথরের টুকরো) ছিল। এই কঙ্করগুলো ছিল মসুর ডালের মতো ছোট, কিন্তু আল্লাহর হুকুমে এগুলোর শক্তি ছিল বুলেটের চেয়েও বেশি।
পাখিগুলো যখন উপর থেকে পাথর ছুড়তে শুরু করল, তখন আবরাহার বিশাল বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কুরআনের ভাষায়, তারা 'চিবানো ভূষির' (عَصْفٍ
مَّأْكُولٍ) মতো হয়ে গেল। আবরাহা নিজেও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
৪. ঐতিহাসিক গুরুত্ব
- এই বছরটিকে আরবরা 'আমুল ফীল' বা হস্তিবর্ষ হিসেবে গণনা করতে শুরু করে।
- মক্কার কুরাইশরা মূর্তিপূজক হওয়া সত্ত্বেও তারা জানত যে, কাবা ঘরটি আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করেছেন।
- এই ঘটনার কিছুকাল পরেই দুনিয়াতে আগমন করেন রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
এই সূরার শিক্ষা:
মানুষের তৈরি কোনো বিশাল শক্তি বা প্রযুক্তি আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে কিছুই নয়। আল্লাহ চাইলে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী দিয়েও দাম্ভিক সম্রাটদের পতন ঘটাতে পারেন।
মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর সফর
১. সফরের সূচনা
একবার মুসা (আ.) বনী ইসরাঈলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। কেউ একজন প্রশ্ন করল, "পৃথিবীতে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে?" মুসা (আ.) বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন, "আমিই (আল্লাহর নবী হিসেবে) সবচেয়ে জ্ঞানী।" আল্লাহ তায়ালা চাইলেন মুসা (আ.)-কে শেখাতে যে, তাঁর আরও এমন বান্দা আছে যাদের বিশেষ জ্ঞান (ইলমে লাদুন্নী) দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে যেতে, যেখানে তিনি এমন এক বান্দার দেখা পাবেন যিনি মুসা (আ.)-এর চেয়েও বিশেষ কিছু বিষয়ে বেশি জানেন।
২. সাক্ষাতের চিহ্ন
আল্লাহর নির্দেশ ছিল—একটি মৃত মাছ সাথে নিতে। যেখানে মাছটি জীবিত হয়ে সাগরে চলে যাবে, সেখানেই সেই মহাজ্ঞানীর দেখা মিলবে। মুসা (আ.) তাঁর খাদেম ইউশা বিন নুনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। এক পাথরের কাছে বিশ্রাম নেওয়ার সময় মাছটি অলৌকিকভাবে প্রাণ পেয়ে সাগরে চলে গেল, কিন্তু তারা তা খেয়াল করলেন না। পরে যখন তারা বুঝতে পারলেন, তখন ফিরে এসে দেখলেন সেখানে এক ব্যক্তি বসে আছেন। তিনিই ছিলেন হযরত খিজির (আ.)।
৩. শর্তসাপেক্ষ সফর
মুসা (আ.) তাঁর সাথে থাকার অনুমতি চাইলেন। খিজির (আ.) বললেন, "আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। কারণ আপনি যা দেখবেন তার রহস্য আপনার জানা থাকবে না।" মুসা (আ.) ধৈর্যের প্রতিশ্রুতি দিলে তারা চলতে শুরু করলেন। তবে শর্ত ছিল—খিজির (আ.) যা-ই করুন না কেন, মুসা (আ.) আগে থেকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না।
৪. তিনটি বিস্ময়কর ঘটনা
- নৌকা ছিদ্র করা: তারা একটি নৌকায় চড়লেন। খিজির (আ.) হঠাৎ নৌকার একটি তক্তা ভেঙে ফেললেন। মুসা (আ.) প্রতিবাদ করে বসলেন, "আপনি কি আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য এটি করলেন?" খিজির (আ.) তাকে শর্তের কথা মনে করিয়ে দিলেন।
- বালক হত্যা: এরপর তারা এক বালকের দেখা পেলেন। খিজির (আ.) তাকে হত্যা করলেন। মুসা (আ.) আঁতকে উঠে বললেন, "একটি নিষ্পাপ প্রাণকে কেন মারলেন?" খিজির (আ.) পুনরায় ধৈর্যের কথা মনে করালেন।
- দেওয়াল মেরামত: তারা এক জনপদে পৌঁছালেন যেখানে কেউ তাদের মেহমানদারি করল না। সেখানে একটি ভেঙে পড়া দেওয়াল দেখে খিজির (আ.) সেটি বিনা পারিশ্রমিকে মেরামত করে দিলেন। মুসা (আ.) বললেন, "আপনি চাইলে তো এর বিনিময়ে মজুরি নিতে পারতেন!"
৫. রহস্যের উন্মোচন
এবার খিজির (আ.) বিদায় নেওয়ার সময় এই কাজের পেছনের 'গোপন রহস্য' ব্যাখ্যা করলেন:
- নৌকা: সামনে এক জালিম রাজা ছিল যে সব ভালো নৌকা জোর করে কেড়ে নিচ্ছিল। নৌকাটি ছিদ্র করে দেওয়ায় রাজা সেটি আর নিল না, ফলে দরিদ্র মালিকদের নৌকাটি রক্ষা পেল।
- বালক: এই বালকটি বড় হয়ে চরম অবাধ্য ও কাফের হতো, যা তার মুমিন বাবা-মায়ের জন্য কষ্টের কারণ হতো। আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়ে তাদের এক নেক সন্তান দান করবেন।
- দেওয়াল: দেওয়ালটির নিচে দুই এতিম শিশুর গুপ্তধন ছিল। তাদের বাবা ছিলেন নেককার। দেওয়ালটি ভেঙে পড়লে লোকজন সেই ধন নিয়ে যেত। আল্লাহ চাইলেন শিশুরা বড় হয়ে যেন তাদের হক পায়।
এই কাহিনীর শিক্ষা:
আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে আল্লাহর সব সিদ্ধান্ত বুঝতে পারি না। অনেক সময় আমাদের জীবনে যা 'বিপদ' মনে হয়, তার পেছনে আল্লাহর বড় কোনো 'কল্যাণ' লুকিয়ে থাকে।

0 Comments