নোবেল
পুরস্কার: বিজয়ী ও তথ্য
নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃত। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের উইলের ভিত্তিতে ১৯০১ সাল থেকে এই পুরস্কার প্রদান করা শুরু হয়।
পুরস্কারের ক্ষেত্রসমূহ
বর্তমানে মোট ৬টি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়:
১. পদার্থবিজ্ঞান
২. রসায়ন
৩. চিকিৎসা বিজ্ঞান
(Physiology or Medicine)
৪. সাহিত্য
৫. শান্তি
৬. অর্থনীতি (এটি ১৯৬৮ সালে প্রবর্তিত হয় এবং ১৯৬৯ থেকে দেওয়া শুরু হয়)
২০২৫ সালের নোবেল বিজয়ীদের তালিকা
২০২৫ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা এই অনন্য সম্মান অর্জন করেছেন:
|
বিভাগ |
বিজয়ী(গণ) |
অবদানের ক্ষেত্র |
|
পদার্থবিজ্ঞান |
জন ক্লার্ক, মিশেল ডিভোরেট এবং জন এম. মার্টিনিস |
ইলেকট্রিক সার্কিটে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং এবং এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন আবিষ্কারের জন্য। |
|
রসায়ন |
ওমর এম ইয়াঘি, সুসুমু কিতাগাওয়া এবং রিচার্ড রবসন |
মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস (MOFs)
তৈরির জন্য। |
|
চিকিৎসা বিজ্ঞান |
মেরি ই. ব্রাঙ্কো, ফ্রেড র্যামসডেল এবং শিমন সাকাগুচি |
পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স সংক্রান্ত আবিষ্কারের জন্য। |
|
সাহিত্য |
লাজলো ক্রাসনাহোরকাই
(László Krasznahorkai) |
তাঁর দূরদর্শী এবং দার্শনিক সাহিত্যকর্মের জন্য। |
|
শান্তি |
মারিয়া করিনা মাচাডো (María
Corina Machado) |
ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ের জন্য। |
|
অর্থনীতি |
জোয়েল মোকির, ফিলিপ আঘিয়ন এবং পিটার হাউইট |
উদ্ভাবন-চালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং 'ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন' তত্ত্বের জন্য। |
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- পুরস্কার প্রদান কেন্দ্র: শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় নরওয়ের ওসলো থেকে। বাকি পাঁচটি পুরস্কার প্রদান করা হয় সুইডেনের স্টকহোম থেকে।
- কনিষ্ঠতম বিজয়ী: মালালা ইউসুফজাই (২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল পান)।
- প্রথম বাঙালি বিজয়ী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পান)।
দ্রষ্টব্য: ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা আগামী ৫ অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবর, ২০২৬-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৪ সালের নোবেল বিজয়ীদের তালিকা
|
বিভাগ |
বিজয়ীর নাম |
অবদানের ক্ষেত্র |
|
চিকিৎসা বিজ্ঞান |
ভিক্টর অ্যামব্রোস এবং গ্যারি রুভকুন |
মাইক্রোআরএনএ
(microRNA) আবিষ্কার এবং পোস্ট-ট্রান্সক্রিপশনাল জিন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা ব্যাখ্যার জন্য। |
|
পদার্থবিজ্ঞান |
জন জে. হপফিল্ড এবং জেফ্রি ই. হিন্টন |
কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মেশিন লার্নিং সম্ভব করার মৌলিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জন্য। |
|
রসায়ন |
ডেভিড বেকার, ডেমিস হাসাবিস এবং জন এম. জাম্পার |
কম্পিউটেশনাল প্রোটিন ডিজাইন (বেকার) এবং প্রোটিন কাঠামোর নিখুঁত পূর্বাভাসের জন্য। |
|
সাহিত্য |
হান কাং (Han
Kang) |
তাঁর তীব্র কাব্যিক গদ্যের জন্য, যা ইতিহাসের ক্ষত এবং মানবজীবনের ভঙ্গুরতাকে তুলে ধরে। |
|
শান্তি |
নিহন হিদানকিও (Nihon
Hidankyo) |
পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচেষ্টা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য। |
|
অর্থনীতি |
দারন আাসেমোগ্লু, সাইমন জনসন এবং জেমস এ. রবিনসন |
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গঠন এবং কীভাবে সেগুলো দেশের সমৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণার জন্য। |
বিশেষ কিছু তথ্য:
- সাহিত্যে ইতিহাস: দক্ষিণ কোরিয়ার লেখক হান কাং প্রথম এশীয় নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন।
- এআই-এর জয়জয়কার: পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন—উভয় ক্ষেত্রেই এআই
(AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট গবেষণাকে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
- শান্তি পুরস্কার: জাপানি সংগঠন 'নিহন হিদানকিও' হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের (হিবাকুশা) একটি তৃণমূল আন্দোলন।
জন ক্লার্ক, মিশেল ডিভোরেট এবং জন এম. মার্টিনিসের এই গবেষণাটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাদের কাজ মূলত আমাদের এই ধারণা দেয় যে, ইলেকট্রিক সার্কিটের মতো বড় বা 'ম্যাক্রোস্কোপিক' সিস্টেমেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়মগুলো কাজ করতে পারে।
নিচে তাদের এই জটিল গবেষণার মূল বিষয়গুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং (MQT)
সাধারণত আমরা জানি যে কোয়ান্টাম টানেলিং ঘটে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা যেমন ইলেকট্রন বা প্রোটনের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, একটি ইলেকট্রিক সার্কিটে (বিশেষ করে জোসেফসন জাংশন ব্যবহার করে) কোটি কোটি ইলেকট্রনের সমষ্টিও একসাথে একটি 'এনার্জি ব্যারিয়ার' বা বাধা টানেলিং করে পার হতে পারে। একেই বলা হয় ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং।
২. এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন (Energy
Quantization)
প্রথাগত সার্কিটে বিদ্যুৎ প্রবাহকে আমরা একটি নিরবচ্ছিন্ন স্রোত হিসেবে দেখি। কিন্তু এই গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, অতি-শীতল তাপমাত্রায় একটি সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিটের এনার্জি লেভেলগুলো পরমাণুর মতোই সুনির্দিষ্ট বা 'কোয়ান্টাইজড'
(Quantized) হয়। অর্থাৎ, সার্কিটটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু শক্তির স্তরেই থাকতে পারে।
কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই গবেষণাটি সরাসরি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর ভিত্তি তৈরি করেছে:
- সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট
(Qubits): বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলো (যেমন গুগল বা আইবিএম-এর কম্পিউটার) এই সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিটের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
- কোয়ান্টাম মেমোরি: ইলেকট্রিক সার্কিটে শক্তির স্তরগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে তথ্যকে কোয়ান্টাম অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
- SQUID সেন্সর: জন ক্লার্কের কাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল ম্যাগনেটিক ফিল্ড মাপার যন্ত্র বা
SQUID (Superconducting Quantum Interference Device) তৈরিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
- জন ক্লার্ক
(John Clarke): ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-র অধ্যাপক। তিনি
SQUID এবং কোয়ান্টাম নয়েজ নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন।
- মিশেল ডিভোরেট
(Michel Devoret): ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, যিনি কোয়ান্টাম সার্কিট থিওরি এবং কিউবিট ডিজাইনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
- জন এম. মার্টিনিস
(John M. Martinis): গুগল কোয়ান্টাম এআই দলের প্রাক্তন প্রধান এবং ইউসি সান্তা বারবারার অধ্যাপক। তিনি প্রথম সফলভাবে সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিটের উচ্চ কার্যকারিতা প্রদর্শন করেন।
ওমর এম ইয়াঘি, সুসুমু কিতাগাওয়া এবং রিচার্ড রবসন—এই তিন রসায়নবিদের যৌথ প্রচেষ্টা রসায়ন বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে, যা রেটিকুলার কেমিস্ট্রি
(Reticular Chemistry) নামে পরিচিত। তাদের উদ্ভাবিত মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস (MOFs) বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং বহুমুখী পদার্থ।
নিচে MOFs এবং এই বিজ্ঞানীদের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস (MOFs) কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, MOF হলো এক ধরণের আণবিক স্পঞ্জ। এটি ধাতু (Metal
ions) এবং জৈব অণু (Organic
linkers) দিয়ে তৈরি একটি ত্রিমাত্রিক খাঁচা সদৃশ গঠন। এর বিশেষত্ব হলো এর বিশাল ছিদ্রযুক্ত এলাকা
(Porosity)।
- উদাহরণস্বরূপ, মাত্র এক গ্রাম ওজনের MOF
পাউডারের ভেতরের ক্ষেত্রফল একটি ফুটবল মাঠের সমান হতে পারে!
২. বিজ্ঞানীদের ভূমিকা ও অবদান
- রিচার্ড রবসন
(Richard Robson): তাকে এই ক্ষেত্রের অগ্রদূত বলা হয়। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি প্রথম ধারণা দেন যে, ধাতু এবং জৈব লিঙ্কার ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক কাঠামোর স্ফটিক তৈরি করা সম্ভব।
- ওমর এম ইয়াঘি
(Omar M. Yaghi): তিনি
MOF-কে গবেষণাগার থেকে বাস্তব প্রয়োগের পর্যায়ে নিয়ে আসেন। তিনি এমন কিছু MOF
(যেমন
MOF-5) তৈরি করেন যা অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য। তিনিই 'রেটিকুলার কেমিস্ট্রি' শব্দটির প্রবর্তক।
- সুসুমু কিতাগাওয়া
(Susumu Kitagawa): তিনি প্রথম প্রমাণ করেন যে, এই কাঠামোর ছিদ্রগুলো গ্যাসের অণু (যেমন মিথেন বা কার্বন ডাই অক্সাইড) ধরে রাখতে সক্ষম। তাঁর গবেষণা গ্যাসের সঞ্চয় এবং পৃথকীকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
৩. MOFs-এর বৈপ্লবিক প্রয়োগ
MOF প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বেশ কিছু বড় সমস্যার সমাধান দিচ্ছে:
- কার্বন ক্যাপচার: এটি বাতাস বা কলকারখানার ধোঁয়া থেকে ক্ষতিকারক
$CO_2$ শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সাহায্য করে।
- মরুভূমিতে পানি সংগ্রহ: ওমর ইয়াঘির তৈরি বিশেষ MOF
ব্যবহার করে অতি শুষ্ক বাতাস থেকেও পানের যোগ্য পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
- হাইড্রোজেন ফুয়েল: ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব গাড়ি চালানোর জন্য হাইড্রোজেন গ্যাসকে নিরাপদভাবে ট্যাঙ্কে জমা রাখতে MOF
ব্যবহৃত হচ্ছে।
- ওষুধ সরবরাহ
(Drug Delivery): শরীরের নির্দিষ্ট কোষে নিখুঁতভাবে ওষুধ পৌঁছে দিতে এই আণবিক খাঁচাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেন এটি যুগান্তকারী?
আগে কোনো পদার্থের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু MOFs-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন নিজেদের প্রয়োজনমতো 'বিল্ডিং ব্লক' সাজিয়ে নতুন নতুন পদার্থ ডিজাইন করতে পারছেন। এটিকে অনেকটা "আণবিক লেগো
(Molecular Lego)" খেলার সাথে তুলনা করা যায়।
মেরি ই. ব্রাঙ্কো, ফ্রেড র্যামসডেল এবং শিমন সাকাগুচি—এই তিন গবেষকের কাজ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত জটিল রহস্য সমাধান করেছে। তাঁদের আবিষ্কারের মূল বিষয় হলো 'পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স', যা মূলত শরীরকে শেখায় কীভাবে নিজের কোষ এবং ক্ষতিকারক জীবাণুর মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।
নিচে তাঁদের এই যুগান্তকারী গবেষণার মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. ইমিউন টলারেন্স (Immune
Tolerance) কী?
আমাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাজ হলো বাইরের ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করা। কিন্তু কখনও কখনও এই ব্যবস্থা ভুল করে নিজের শরীরের সুস্থ কোষগুলোকেই আক্রমণ করতে শুরু করে। শরীর যাতে নিজের কোষকে আক্রমণ না করে, সেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই বলা হয় ইমিউন টলারেন্স।
২. বিজ্ঞানীদের বিশেষ অবদান
- শিমন সাকাগুচি
(Shimon Sakaguchi): তিনি Regulatory
T-cells (Tregs) নামক এক বিশেষ ধরণের শ্বেত রক্তকণিকা আবিষ্কার করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, এই কোষগুলো ইমিউন সিস্টেমের
"পুলিশ" হিসেবে কাজ করে এবং অন্য ইমিউন কোষগুলোকে নিজের শরীরের ওপর আক্রমণ করা থেকে থামিয়ে রাখে।
- ফ্রেড র্যামসডেল
(Fred Ramsdell): তিনি FOXP3
নামক একটি জিন শনাক্ত করেন, যা এই
'Tregs' কোষগুলো তৈরির জন্য দায়ী। তিনি দেখান যে, এই জিনে সমস্যা থাকলে শরীর আর নিজের ইমিউন সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, ফলে মারাত্মক অটোইমিউন রোগ দেখা দেয়।
- মেরি ই. ব্রাঙ্কো
(Mary E. Brunkow): তিনি মূলত জেনেটিক গবেষণার মাধ্যমে ইমিউন সিস্টেমের এই নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণগুলো খুঁজে বের করতে সাহায্য করেন, যা পরবর্তীকালে
FOXP3 জিনের গুরুত্ব প্রমাণে সহায়ক হয়।
৩. এই আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞানে দুটি বিশাল বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে:
- অটোইমিউন রোগের চিকিৎসা: টাইপ-১ ডায়াবেটিস, লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে যেখানে শরীর নিজেকেই আক্রমণ করে, সেখানে এই
'Tregs' কোষগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরণের থেরাপি তৈরি হচ্ছে।
- অঙ্গ প্রতিস্থাপন
(Organ Transplant): যখন কারও শরীরে অন্য কোনো মানুষের অঙ্গ (যেমন কিডনি বা লিভার) প্রতিস্থাপন করা হয়, তখন ইমিউন সিস্টেম সেটিকে 'শত্রু' ভেবে আক্রমণ করে। এই বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ফলে এখন এমন পদ্ধতি বের করার চেষ্টা চলছে যাতে ইমিউন সিস্টেমকে সেই নতুন অঙ্গটি সহ্য করতে শেখানো যায়।
- ক্যান্সার থেরাপি: ক্যান্সার কোষগুলো অনেক সময় এই
'Tregs' কোষগুলোকে ব্যবহার করে ইমিউন সিস্টেমের হাত থেকে লুকিয়ে থাকে। তাঁদের এই গবেষণা ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপিতেও নতুন দিশা দেখিয়েছে।
সহজ কথায় এর প্রভাব
আগে আমরা জানতাম না কেন শরীর হঠাৎ নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই তিন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার আমাদের সেই 'ব্রেক' বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে, যা আমাদের সুস্থ রাখতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।
হাঙ্গেরীয় লেখক লাজলো ক্রাসনাহোরকাই (László
Krasznahorkai) বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এবং রহস্যময় সাহিত্যিক। তাঁর লেখনি কেবল গল্প বলা নয়, বরং অস্তিত্বের গভীর সংকট এবং মহাজাগতিক একাকীত্বের এক দার্শনিক যাত্রা। নোবেল কমিটির দৃষ্টিতে তাঁর কাজ "দূরদর্শী এবং দার্শনিক," কারণ তিনি আধুনিক মানুষের নৈতিক পতন এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে এক অনন্য শৈলীতে তুলে ধরেছেন।
নিচে তাঁর সাহিত্যকর্মের বিশেষ দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. লিখনশৈলী: 'অনন্ত বাক্য' (The
Infinite Sentence)
ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল বাক্য। তাঁর এক একটি বাক্য কয়েক পৃষ্ঠা পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
- কেন এই শৈলী? তিনি বিশ্বাস করেন যে জীবন এবং মানুষের চিন্তা কোনো ফুলস্টপ বা কমা দিয়ে ভাগ করা যায় না; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন স্রোত। এই দীর্ঘ বাক্যগুলো পাঠককে একটি ঘোরের
(Trance) মধ্যে নিয়ে যায়, যা অনেকটা ধ্যানের মতো।
২. প্রধান বিষয়বস্তু: ধ্বংস এবং অস্তিত্ববাদ
তাঁর উপন্যাসে সাধারণত এমন এক জগতের চিত্র ফুটে ওঠে যা ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
- মানুষের অসহায়ত্ব: তিনি দেখান যে মানুষ তার চারপাশের বিশৃঙ্খলা
(Chaos) থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়তির কাছে পরাজিত হয়।
- দার্শনিক ভিত্তি: তাঁর লেখায় ফ্রিডরিখ নিৎশে এবং কাফকার দর্শনের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি আধুনিক সভ্যতাকে এক ধরণের 'অপেক্ষার ঘর' হিসেবে দেখেন, যেখানে সবাই কোনো এক অজানার অপেক্ষায় দিন কাটায়।
৩. উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম
তাঁর বেশ কিছু বই বিশ্বসাহিত্যে ধ্রুপদী
(Classic) মর্যাদা পেয়েছে:
- সাতানট্যাঙ্গো
(Satantango): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। একটি পরিত্যক্ত খামারের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাসে মানুষের লালসা এবং বিশ্বাসঘাতকতা ফুটে উঠেছে। হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্রকার বেলা টার
(Béla Tarr) এর ওপর ভিত্তি করে ৭ ঘণ্টার একটি বিখ্যাত সিনেমাও তৈরি করেছেন।
- দ্য মেলানকোলি অফ রেজিস্ট্যান্স
(The Melancholy of Resistance): এটি এক অদ্ভুত সার্কাস দল এবং একটি বিশাল তিমির মৃতদেহ নিয়ে লেখা, যা সমাজের বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পতনের প্রতীক।
- ব্যারন ওয়েনখেইম'স কামব্যাক
(Baron Wenckheim's Homecoming): এই বইটির জন্য তিনি ২০১৯ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
৪. কেন তাঁকে "দূরদর্শী" বলা হয়?
ক্রাসনাহোরকাই এমন এক অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা বলেন যা সরাসরি আমাদের বর্তমান সময়ের সাথে মিলে যায়। তিনি দেখান যে কীভাবে প্রযুক্তি এবং তথ্যের ভিড়ে মানুষ তার নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলছে। তাঁর সাহিত্য পাঠ করা মানে নিজের ভেতরের অন্ধকার ও আলোর সাথে মুখোমুখি হওয়া।
"আমি এমন এক জগতের কথা লিখি যেখানে দেবতারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, আর আমরা কেবল তাদের ফেলে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি।" — লাজলো ক্রাসনাহোরকাই (সারমর্ম)
ভেনেজুয়েলার লৌহমানবী হিসেবে পরিচিত মারিয়া করিনা মাচাডো (María
Corina Machado) ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর এই প্রাপ্তি কেবল একজন ব্যক্তির সম্মান নয়, বরং এটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি জাতির দীর্ঘ লড়াই এবং গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
নিচে তাঁর জীবন ও সংগ্রামের মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. প্রেক্ষাপট: ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট
ভেনেজুয়েলা গত দুই দশক ধরে এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচনী জালিয়াতি এবং বিরোধী মত দমনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এই প্রতিকূল পরিবেশেই মারিয়া করিনা মাচাডো সাধারণ মানুষের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
২. রাজনৈতিক যাত্রা ও আদর্শ
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: তিনি একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার এবং ইয়েল ইউনিভার্সিটির 'ওয়ার্ল্ড ফেলো'। তাঁর এই যৌক্তিক ও সুশৃঙ্খল চিন্তাভাবনা তাঁর রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয়।
- ভেন্টে ভেনিজুয়েলা: তিনি 'ভেন্টে ভেনিজুয়েলা'
(Vente Venezuela) নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যার মূল মন্ত্র হলো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং আইনের শাসন।
- নির্বাচনী লড়াই: ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হতে বাধা দেওয়া হলেও, তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি সারা দেশ ভ্রমণ করে সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং বিরোধী জোটের প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
৩. কেন তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন?
নোবেল কমিটি তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছে:
- অহিংস আন্দোলন: চরম দমন-পীড়ন এবং প্রাণনাশের হুমকির মুখেও তিনি সবসময় অহিংস আন্দোলনের পথে থেকেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বুলেটের চেয়ে ব্যালটের শক্তি বেশি।
- মানবাধিকার রক্ষা: ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং সাধারণ মানুষের বাক-স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক মহলে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গেছেন।
- গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার: বছরের পর বছর ধরে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, জনগণের ইচ্ছাই শেষ কথা। তাঁর নেতৃত্ব ভেনেজুয়েলার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছে।
৪. তাঁর লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জসমূহ
মারিয়া করিনা মাচাডোকে অসংখ্যবার কারাবরণ করতে হয়েছে, তাঁর ওপর শারীরিক হামলা হয়েছে এবং তাকে সরকারি পদ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও তিনি দেশ ছেড়ে পালাননি, বরং দেশের ভেতরে থেকেই লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁর এই অদম্য জেদই তাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
"আমরা এই লড়াই করছি কেবল একটি সরকারকে পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং আমাদের হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ার জন্য।" — মারিয়া করিনা মাচাডো
জোয়েল মোকির, ফিলিপ আঘিয়ন এবং পিটার হাউইট—এই তিন অর্থনীতিবিদের কাজ আমাদের বোঝায় যে কীভাবে একটি দেশ বা সমাজ দীর্ঘমেয়াদে ধনী এবং উন্নত হতে পারে। তাদের গবেষণার মূল ভিত্তি হলো 'উদ্ভাবন'
(Innovation) এবং 'ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন'
(Creative Destruction)।
নিচে তাদের এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূল দিকগুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ফিলিপ আঘিয়ন এবং পিটার হাউইট: 'ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন' তত্ত্ব
এই দুই অর্থনীতিবিদ অস্ট্রো-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুম্পিটারের 'ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন' (সৃজনশীল ধ্বংস) ধারণাকে আধুনিক গণিত ও অর্থনীতির মডেলে রূপান্তর করেছেন।
- মূল ধারণা: নতুন কোনো উন্নত প্রযুক্তি বা পণ্য যখন বাজারে আসে, তখন সেটি পুরনো এবং কম দক্ষ প্রযুক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। যেমন: স্মার্টফোন আসার ফলে টাইপরাইটার বা সাধারণ ক্যামেরার বাজার ধ্বংস হয়ে গেছে।
- প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন: তারা দেখিয়েছেন যে, এই 'ধ্বংস' প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অর্থনীতিতে নতুন পুঁজি এবং মেধা বিনিয়োগ হয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি দেশের জিডিপি
(GDP) বৃদ্ধি করে।
২. জোয়েল মোকির: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিহাস ও জ্ঞান
জোয়েল মোকির একজন বিখ্যাত অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ। তিনি দেখিয়েছেন যে, কেবল পুঁজি বা শ্রম নয়, বরং 'দরকারী জ্ঞান' (Useful
Knowledge) হলো প্রবৃদ্ধির আসল চাবিকাঠি।
- শিল্প বিপ্লবের রহস্য: তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন শিল্প বিপ্লব ইউরোপে শুরু হয়েছিল। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের প্রসার এবং সেই জ্ঞানকে ব্যবহারিক কাজে লাগানোর মানসিকতাই ইউরোপকে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিয়েছিল।
- সংস্কৃতি ও প্রবৃদ্ধি: তিনি মনে করেন, একটি সমাজের সংস্কৃতি যদি নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষাকে সমর্থন করে, তবেই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব।
৩. কেন এই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই তিন অর্থনীতিবিদের তত্ত্ব বর্তমান বিশ্বের নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে:
- মনোপলি বা একচেটিয়া আধিপত্য রোধ: তারা দেখিয়েছেন যে, পুরনো বড় কোম্পানিগুলো যদি নতুনদের আসতে বাধা দেয় (যাতে তাদের পুরনো প্রযুক্তি ধ্বংস না হয়), তবে দেশের প্রবৃদ্ধি থমকে যায়। তাই সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
- গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ
(R&D): সরকার কেন বিজ্ঞান এবং গবেষণায় ভর্তুকি দেবে, তার শক্তিশালী যুক্তি পাওয়া যায় তাদের এই তত্ত্ব থেকে।
- শিক্ষা ও দক্ষতা: নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির গুরুত্ব তাদের গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে।
৪. বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
- ফিলিপ আঘিয়ন
(Philippe Aghion): কলেজ ডি ফ্রান্স এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এর অধ্যাপক। তিনি প্রবৃদ্ধি তত্ত্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ।
- পিটার হাউইট
(Peter Howitt): ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক। আঘিয়নের সাথে মিলে তিনি 'শুম্পিটারিয়ান গ্রোথ থিওরি' প্রতিষ্ঠা করেন।
- জোয়েল মোকির
(Joel Mokyr): নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। তিনি অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং প্রযুক্তির বিবর্তন নিয়ে কাজের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
সারকথা: তাদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নতি কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি হলো প্রতিনিয়ত পুরনোকে বিদায় জানিয়ে নতুন উদ্ভাবনকে স্বাগত জানানোর একটি গতিশীল প্রক্রিয়া।
২০২৪ সালের নোবেল বিজয়ীদের তালিকা
ভিক্টর অ্যামব্রোস এবং গ্যারি রুভকুন ২০২৪ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁদের এই আবিষ্কার আমাদের শরীরের কোষগুলো কীভাবে কাজ করে, সেই মৌলিক ধারণাটিকেই বদলে দিয়েছে। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে এক ধরণের "ক্ষুদ্র নিয়ন্ত্রক"
(microRNA) আছে, যা নির্ধারণ করে কোন জিনটি কখন কাজ করবে।
নিচে তাঁদের এই বৈপ্লবিক আবিষ্কারের মূল বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো:
১. মাইক্রোআরএনএ
(microRNA) কী?
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ডিএনএ (DNA) একই রকম, কিন্তু আমাদের চোখের কোষ এবং হার্টের কোষের কাজ আলাদা। এর কারণ হলো সব কোষ সব জিন ব্যবহার করে না। অ্যামব্রোস এবং রুভকুন আবিষ্কার করেন যে, microRNA
হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক ধরণের আরএনএ অণু, যা প্রোটিন তৈরি করে না, বরং প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধা দেয় বা নিয়ন্ত্রণ করে।
২. পোস্ট-ট্রান্সক্রিপশনাল জিন নিয়ন্ত্রণ
সাধারণত ডিএনএ থেকে মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA) তৈরি হয় এবং সেই mRNA থেকে প্রোটিন তৈরি হয়।
- আবিষ্কারের মূল কথা: এই বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে,
microRNA গিয়ে নির্দিষ্ট
mRNA-র সাথে আটকে যায়। এর ফলে ওই
mRNA আর প্রোটিন তৈরি করতে পারে না। একেই বলা হয় 'পোস্ট-ট্রান্সক্রিপশনাল জিন রেগুলেশন'। অর্থাৎ, প্রোটিন তৈরির একদম শেষ মুহূর্তে এসে
microRNA সেই প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেয়।
৩. গবেষণার ইতিহাস: একটি ছোট্ট কৃমির গল্প
তাঁরা তাঁদের গবেষণা চালিয়েছিলেন C.
elegans নামক মাত্র ১ মিলিমিটার লম্বা একটি গোলকৃমির ওপর।
- ১৯৯৩ সালে তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, এই কৃমির বিকাশের জন্য দায়ী একটি জিন অন্য একটি ছোট আরএনএ অণু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
- শুরুতে অনেকে ভেবেছিলেন এটি কেবল কৃমির ক্ষেত্রেই ঘটে। কিন্তু পরে দেখা যায় যে, মানুষসহ প্রায় সমস্ত বহুকোষী প্রাণীর শরীরের ভেতরেই এই ব্যবস্থা বিদ্যমান।
৪. এই আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই আবিষ্কারটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে কারণ:
- ক্যান্সার গবেষণা: অনেক সময় শরীরে
microRNA-র ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে, যা ক্যান্সার তৈরি করে। এই আবিষ্কার ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় সাহায্য করছে।
- জন্মগত ত্রুটি: ভ্রূণের বিকাশের সময়
microRNA সঠিকভাবে কাজ না করলে বিভিন্ন শারীরিক বিকৃতি ঘটতে পারে।
- জটিল রোগ: হৃদরোগ এবং স্নায়বিক রোগের (যেমন অ্যালঝাইমার্স) চিকিৎসায়
microRNA-কে লক্ষ্য করে নতুন ধরণের ওষুধ তৈরির গবেষণা চলছে।
বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
- ভিক্টর অ্যামব্রোস
(Victor Ambros): তিনি ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম
'lin-4' নামক প্রথম
microRNA-টি আবিষ্কার করেন।
- গ্যারি রুভকুন
(Gary Ruvkun): তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক। তিনি দেখিয়েছিলেন যে কীভাবে
microRNA নির্দিষ্ট টার্গেট
mRNA-র সাথে মিলে গিয়ে জিন নিয়ন্ত্রণ করে।
সারকথা: ডিএনএ যদি হয় জীবনের ব্লু-প্রিন্ট, তবে microRNA
হলো সেই ইঞ্জিনিয়ার যে ঠিক করে দেয় কোন সময় কোন দেয়ালটি তৈরি হবে আর কোনটি হবে না।
জন জে. হপফিল্ড এবং জেফ্রি ই. হিন্টন ২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের এই পুরস্কার প্রাপ্তি কিছুটা চমকপ্রদ ছিল, কারণ তাঁরা মূলত কম্পিউটার বিজ্ঞানের (AI) ভিত্তি তৈরি করেছেন। তবে নোবেল কমিটি তাঁদের এই কাজকে পদার্থবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করেছে, কারণ তাঁদের উদ্ভাবিত মডেলগুলো পরিসংখ্যানগত পদার্থবিজ্ঞানের
(Statistical Physics) নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
নিচে তাঁদের যুগান্তকারী কাজগুলো আলোচনা করা হলো:
১. জন জে. হপফিল্ড: 'হপফিল্ড নেটওয়ার্ক'
(Hopfield Network)
জন হপফিল্ড এমন একটি মেমোরি সিস্টেম তৈরি করেন যা মানুষের মস্তিষ্কের মতো কাজ করে। একে বলা হয় অ্যাসোসিয়েটিভ মেমোরি।
- কীভাবে কাজ করে? ধরুন, আপনি একটি ঝাপসা ছবি বা অর্ধেক লেখা একটি শব্দ দেখলেন। হপফিল্ড নেটওয়ার্ক সেই অসম্পূর্ণ তথ্য থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্যটি উদ্ধার করতে পারে।
- পদার্থবিজ্ঞানের সংযোগ: এটি কাজ করে পদার্থের 'পারমাণবিক স্পিন'
(Atomic Spin) এবং এনার্জি স্টেটের ধারণার ওপর। নেটওয়ার্কটি এমনভাবে তথ্য জমা রাখে যাতে সিস্টেমটি সর্বনিম্ন শক্তির স্তরে
(Lowest Energy State) পৌঁছালে সঠিক তথ্যটি খুঁজে পায়।
২. জেফ্রি ই. হিন্টন: 'বোল্টজম্যান মেশিন'
(Boltzmann Machine)
জেফ্রি হিন্টন (যাকে 'গডফাদার অফ এআই' বলা হয়) হপফিল্ডের কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি ১৯শ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞানী লডভিগ বোল্টজম্যানের পরিসংখ্যানগত সমীকরণ ব্যবহার করে বোল্টজম্যান মেশিন তৈরি করেন।
- মেশিন লার্নিংয়ের শুরু: এই মডেলটি নিজে থেকেই ডেটার মধ্যে থাকা প্যাটার্ন বা বৈশিষ্ট্য চিনতে পারে। এটি কেবল তথ্য জমা রাখে না, বরং নতুন তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস
(Classification) করতে পারে।
- ডিপ লার্নিং: এটিই আজকের আধুনিক 'ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্ক'-এর ভিত্তি, যা দিয়ে আমরা চ্যাটজিপিটি
(ChatGPT) বা ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তির মতো উন্নত এআই ব্যবহার করছি।
৩. কেন এই আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই দুই বিজ্ঞানীর কাজের ফলেই আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লব সম্ভব হয়েছে:
- ডেটা প্রসেসিং: বিশাল পরিমাণ তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় প্যাটার্ন খুঁজে বের করা এখন এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত সম্ভব হচ্ছে।
- বিজ্ঞান ও গবেষণা: এই নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এখন নতুন ওষুধ তৈরি, প্রোটিন গঠন বিশ্লেষণ এবং মহাকাশ গবেষণায় জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান করছেন।
- দৈনন্দিন জীবন: স্মার্টফোনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি—সবকিছুর পেছনেই তাঁদের উদ্ভাবিত লজিক কাজ করছে।
৪. বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
- জন জে. হপফিল্ড
(John J. Hopfield): প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে নিউরাল নেটওয়ার্কের গাণিতিক ভিত্তি তৈরি করেন।
- জেফ্রি ই. হিন্টন
(Geoffrey E. Hinton): ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো-র অধ্যাপক এবং গুগলের প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে তাঁর সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন।
মজার তথ্য: জেফ্রি হিন্টন সাম্প্রতিক সময়ে এআই-এর দ্রুত উন্নতি এবং এর সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করে আসছেন, যা তাঁর চিন্তাশীল ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়।
ডেভিড বেকার, ডেমিস হাসাবিস এবং জন এম. জাম্পার ২০২৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের এই যৌথ আবিষ্কার জীববিজ্ঞানের ৫০ বছরের পুরনো একটি রহস্য সমাধান করেছে—যাকে বলা হয় "প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যা"।
নিচে তাঁদের যুগান্তকারী কাজের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. ডেমিস হাসাবিস এবং জন এম. জাম্পার:
'AlphaFold2'
প্রোটিন হলো অ্যামিনো অ্যাসিডের লম্বা শিকল, যা একটি সুনির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক (3D) আকারে ভাঁজ হয়ে থাকে। এই আকারই ঠিক করে দেয় প্রোটিনটি শরীরে কী কাজ করবে। দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীরা অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম দেখে প্রোটিনের সঠিক আকার বুঝতে পারছিলেন না।
- AlphaFold2: ডেমিস হাসাবিস এবং জন জাম্পার
(Google DeepMind-এর গবেষক) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে AlphaFold2
নামক একটি মডেল তৈরি করেন।
- সাফল্য: এই মডেলটি প্রায় ২০ কোটি প্রোটিনের গঠন নিখুঁতভাবে বলে দিতে পেরেছে, যা আগে বিজ্ঞানীদের কয়েক দশকের গবেষণাতেও সম্ভব ছিল না।
২. ডেভিড বেকার: 'রিসেটা'
(Rosetta) ও নতুন প্রোটিন তৈরি
হাসাবিস এবং জাম্পার যেখানে বিদ্যমান প্রোটিনের আকার বের করেছেন, ডেভিড বেকার সেখানে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি কম্পিউটেশনাল পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের প্রোটিন ডিজাইন করেছেন যা প্রকৃতিতে আগে ছিল না।
- নতুন সৃষ্টি: তিনি ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে
'Rosetta' নামক সফটওয়্যার ব্যবহার করে এমন সব প্রোটিন তৈরি করেছেন যা ওষুধ, টিকা বা নতুন সেন্সর হিসেবে কাজ করতে পারে।
৩. কেন এই আবিষ্কার রসায়নের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে?
প্রোটিন হলো জীবনের মূল ভিত্তি। তাঁদের এই কাজের ফলে চিকিৎসা ও পরিবেশ বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে:
- দ্রুত ওষুধ তৈরি: আগে একটি ওষুধের কার্যকারিতা বুঝতে প্রোটিন স্ট্রাকচার বের করতেই বছরের পর বছর লাগত। এখন AI-এর সাহায্যে তা কয়েক মিনিটেই সম্ভব।
- অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: নতুন ধরণের প্রোটিন ডিজাইন করে সুপারবাগ বা ঔষধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ হবে।
- পরিবেশ রক্ষা: এমন এনজাইম (প্রোটিন) তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে যা প্লাস্টিক পচাতে বা পরিবেশ থেকে বিষাক্ত পদার্থ সরাতে সাহায্য করবে।
- ভ্যাকসিন উদ্ভাবন: করোনা মহামারীর সময় এবং পরবর্তী বিভিন্ন ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
৪. বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
- ডেভিড বেকার
(David Baker): ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন-এর অধ্যাপক। তিনি প্রোটিন ডিজাইন গবেষণাগারের প্রতিষ্ঠাতা।
- ডেমিস হাসাবিস
(Demis Hassabis): গুগল ডিপমাইন্ড
(Google DeepMind)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। তাঁকে আধুনিক AI গবেষণার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মনে করা হয়।
- জন এম. জাম্পার
(John M. Jumper): গুগল ডিপমাইন্ড-এর সিনিয়র রিসার্চ সায়েন্টিস্ট। তিনি
AlphaFold2 মডেলের প্রধান কারিগর।
সারকথা: আগে আমরা প্রোটিনের গঠন 'পড়তে' পারতাম না, এখন আমরা সেটি পড়তে পারছি এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো নতুন প্রোটিন 'লিখতেও' পারছি।
দক্ষিণ কোরিয়ার লেখক হান কাং (Han
Kang) ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়ে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তিনি প্রথম দক্ষিণ কোরীয় লেখক এবং প্রথম এশীয় নারী হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন। নোবেল কমিটির মতে, তাঁর গদ্য "তীব্র কাব্যিক," যা ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা এবং মানুষের শারীরিক ও মানসিক অস্তিত্বের ভঙ্গুরতাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলে।
নিচে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য ও উল্লেখযোগ্য দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. লিখনশৈলী: কাব্যিক গদ্য ও শরীরের ভাষা
হান কাংয়ের লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর বর্ণনার স্বচ্ছতা এবং শারীরিক কষ্টকে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা। তিনি কেবল মনের যন্ত্রণার কথা বলেন না, বরং সেই যন্ত্রণা কীভাবে মানুষের শরীরে প্রভাব ফেলে, তা বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তাঁর গদ্যে এক ধরণের বিষাদময় সৌন্দর্য
(Melancholic Beauty) থাকে যা পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
২. প্রধান উপজীব্য বিষয়
- ইতিহাসের ক্ষত: তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলো (যেমন গ্ওয়াংজু গণহত্যা) নিয়ে লিখেছেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার সাধারণ মানুষের হাহাকার ফুটে উঠেছে।
- মানবজীবনের ভঙ্গুরতা: জীবন কতটুকু নশ্বর এবং মানুষের অস্তিত্ব কতটা ঠুনকো, তা তাঁর গল্পের অন্যতম প্রধান বিষয়।
- বিদ্রোহ ও নীরবতা: তাঁর চরিত্ররা অনেক সময় সমাজের প্রথা বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে 'নীরবতা' বা 'প্রত্যাখ্যান'-এর মাধ্যমে নিজেদের প্রতিবাদ জানায়।
৩. উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম
তাঁর বেশ কিছু বই আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এবং অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে:
- দ্য ভেজিটেরিয়ান
(The Vegetarian): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস, যার জন্য তিনি ২০১৬ সালে 'ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল' পুরস্কার পান। এতে একজন নারী হঠাৎ মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন, যা তাঁর পরিবার ও সমাজে এক চরম অস্থিরতা তৈরি করে। এটি মূলত মানুষের আত্মপরিচয় এবং সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার এক প্রতীকী গল্প।
- হিউম্যান অ্যাক্টস
(Human Acts): ১৯৮০ সালের গ্ওয়াংজু ছাত্র আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে লেখা এই বইটি ইতিহাসের নৃশংসতা এবং লাশের স্তূপের মাঝেও মানুষের মানবিকতা ও স্মৃতি রক্ষার গল্প বলে।
- দ্য হোয়াইট বুক
(The White Book): এটি একটি আত্মজৈবনিক এবং অত্যন্ত আধ্যাত্মিক বই, যেখানে তিনি সাদা রঙের বিভিন্ন বস্তুর মাধ্যমে তাঁর মৃত বড় বোনের শোক এবং পবিত্রতাকে ব্যাখ্যা করেছেন।
- উই ডু নট পার্ট (We
Do Not Part): এই বইটিতে তিনি জেজু দ্বীপের ট্র্যাজেডি এবং বংশপরম্পরায় বয়ে চলা শোকের কথা তুলে ধরেছেন।
৪. কেন তাঁর নোবেল জয় গুরুত্বপূর্ণ?
হান কাংয়ের নোবেল জয় বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে দক্ষিণ কোরীয় সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে কীভাবে ব্যক্তিগত শোক এবং দেশের ইতিহাসকে বিশ্বজনীন ভাষায় রূপান্তর করা যায়। তাঁর লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষতবিক্ষত ইতিহাসের মাঝেও টিকে থাকাই হলো মানুষের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
"আমি মনে করি মানুষ হলো এমন এক সত্তা যে একই সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং অত্যন্ত কোমল।" — হান কাং
জাপানি সংগঠন নিহন হিদানকিও
(Nihon Hidankyo) ২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেছে। এটি মূলত হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের (যাদের জাপানি ভাষায় 'হিবাকুশা' বলা হয়) একটি তৃণমূল আন্দোলন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে পুঁজি করে তারা গত সাত দশক ধরে পৃথিবীকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার জন্য নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
১. নিহন হিদানকিও-র পটভূমি
১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার আঘাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। যারা বেঁচে ছিলেন, তারা কেবল শারীরিক ক্ষত নয়, বরং তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে এই হিবাকুশারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে 'নিহন হিদানকিও' গঠন করেন।
২. কেন তারা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেল?
নোবেল কমিটি তাদের নাম ঘোষণা করার সময় কয়েকটি বিশেষ দিকের ওপর জোর দিয়েছে:
·
সাক্ষ্যপ্রদান
(Bearing Witness): হিবাকুশারা তাদের ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প, শরীরের ক্ষত এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। তাদের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পারমাণবিক অস্ত্রের তাত্ত্বিক ভয়াবহতাকে একটি মানবিক রূপ দিয়েছে।
·
পারমাণবিক ট্যাবু
(Nuclear Taboo): গত ৮০ বছর ধরে পৃথিবীতে আর কোনো পারমাণবিক যুদ্ধ হয়নি। নোবেল কমিটির মতে, এই 'পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা' বা ট্যাবু তৈরিতে নিহন হিদানকিও-র অবদান অনস্বীকার্য। তারা বিশ্বনেতাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই অস্ত্র ব্যবহার করা মানেই মানবসভ্যতার বিনাশ।
·
অহিংস আন্দোলন: চরম কষ্টের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো প্রতিশোধের কথা বলেননি। বরং তারা শান্তির পথে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
৩. তাঁদের মূল দাবি ও সাফল্য
নিহন হিদানকিও-র প্রধান লক্ষ্য ছিল দুটি:
১. হিবাকুশাদের জন্য সরকারি সাহায্য ও সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করা।
২. বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
তাদের আন্দোলনের ফলেই ২০১৭ সালে জাতিসংঘে 'পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি'
(TPNW) গৃহীত হয়, যা বিশ্বশান্তির পথে একটি বড় পদক্ষেপ।
৪. বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনা বাড়ছে। অনেক দেশ আবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছে। এমন সময়ে নিহন হিদানকিও-কে নোবেল প্রদান একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়—যে ভুল ১৯৪৫ সালে হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনো না হয়।
"শান্তি মানে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, শান্তি মানে হলো এমন এক পৃথিবী যেখানে কোনো মা-কে আর তাঁর সন্তানকে পারমাণবিক আগুনে পুড়তে দেখতে হবে না।" — নিহন হিদানকিও-র একজন প্রতিনিধির বক্তব্য (সারমর্ম)।
দারন আসেমোগ্লু, সাইমন জনসন এবং জেমস এ. রবিনসন ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের গবেষণা একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে: "কেন কিছু দেশ অনেক ধনী এবং কিছু দেশ অনেক দরিদ্র?"
তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, একটি দেশের উন্নতির পেছনে কেবল ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং সেই দেশের 'প্রতিষ্ঠান'
(Institutions) বা শাসনব্যবস্থার ধরন সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
নিচে তাঁদের গবেষণার মূল বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো:
১. ইনক্লুসিভ বনাম এক্সট্রাক্টিভ প্রতিষ্ঠান
তাঁরা বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর শাসনব্যবস্থাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন:
- ইনক্লুসিভ (Inclusive) বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান: এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত থাকে, আইন সবার জন্য সমান এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: দক্ষিণ কোরিয়া। এখানে মানুষ পরিশ্রম করলে তার ফল পায়, তাই দেশ দ্রুত উন্নত হয়।
- এক্সট্রাক্টিভ
(Extractive) বা শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান: এখানে ক্ষমতা এবং সম্পদ কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকে। সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার থাকে না এবং তাদের পরিশ্রমের ফল শাসকগোষ্ঠী ভোগ করে। উদাহরণস্বরূপ: উত্তর কোরিয়া। এই ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি সম্ভব নয়।
২. ইতিহাসের প্রভাব ও ঔপনিবেশিক শাসন
তাঁরা গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ঔপনিবেশিক শাসকরা যেখানে বাস করার উপযোগী পরিবেশ পায়নি (যেমন ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকা), সেখানে তারা কেবল সম্পদ শোষণের জন্য 'এক্সট্রাক্টিভ' প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। আর যেখানে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল, সেখানে তারা উন্নত ও 'ইনক্লুসিভ' প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। এই ঐতিহাসিক কাঠামোর প্রভাব আজও অনেক দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট।
৩. গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, গণতন্ত্র সব সময় নিখুঁত না হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। কারণ গণতন্ত্র 'ইনক্লুসিভ' প্রতিষ্ঠান গড়তে সাহায্য করে, যা সাধারণ মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগায়।
কেন এই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ?
- দারিদ্য বিমোচন: কেন অনেক সাহায্য
(Aid) দেওয়ার পরেও কিছু দেশ দরিদ্র থেকে যাচ্ছে, তা বুঝতে এই গবেষণা সাহায্য করে। প্রতিষ্ঠান ঠিক না করলে কেবল টাকা দিয়ে উন্নতি সম্ভব নয়।
- নীতি নির্ধারণ: এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝায় যে, দুর্নীতি কমানো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
- সামাজিক স্থিতিশীলতা: শোষণমূলক ব্যবস্থা ভেঙে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ার প্রয়োজনীয়তা তাঁদের কাজে উঠে এসেছে।
বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
- দারন আসেমোগ্লু
(Daron Acemoglu): এমআইটি
(MIT)-র অধ্যাপক। তাঁর বিখ্যাত বই 'Why
Nations Fail' বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
- সাইমন জনসন
(Simon Johnson): এমআইটি-র অধ্যাপক এবং আইএমএফ
(IMF)-এর প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ।
- জেমস এ. রবিনসন
(James A. Robinson): শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, যিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ।
সারকথা: কোনো দেশের সমৃদ্ধি কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই দেশ তার নাগরিকদের কতটা সুযোগ ও নিরাপত্তা দিচ্ছে তার ওপর।

0 Comments